08, Aug-2022 || 09:16 am
Home কলকাতা রাজ্য জয়েন্টে আদিবাসী ও তপসিলি পড়ুয়াদের বাজিমাৎ

রাজ্য জয়েন্টে আদিবাসী ও তপসিলি পড়ুয়াদের বাজিমাৎ

ঈশানী মল্লিক,কোলকাতা: লক্ষ টাকার ট্রেনিং নয়, রাজ্য সরকারের স্টাইপেন্ডারি বিনামূল্য প্রশিক্ষণই উজ্জ্বল ভবিষ্যতের রসদ জোগাচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ ও আদিবাসী উন্নয়ন বিভাগ-এর উদ্যোগ ও ন্যাশনাল কম্পিউটার সাক্ষরতা মিশন-এর যৌথ প্রয়াস-এ ২০২১-২০২২ শিক্ষাবর্ষে বিগত ৬ মাস গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে তপসিলি জাতি ও আদিবাসী সম্প্রদায়ভুক্ত অর্থাৎ সমাজে আর্থিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা ছেলেমেয়েদের ওয়েস্ট বেঙ্গল জয়েন্ট, জয়েন্ট এন্ট্রান্স মেইন

ও সর্বভারতীয় মেডিকেল (নিট)-এর প্রবেশিকা পরীক্ষার বিনামূল্যে কোচিং দেওয়া হয়। 

পশ্চিমবঙ্গের সব জেলার ৩৪ টি কেন্দ্রে মোট ১৪৪০ জন তপসিলি জাতি ও আদিবাসী ছেলেমেয়েদের সপ্তাহান্তে শনি ও রবিবার নিয়মিত ৪ ঘণ্টা করে অনলাইন ও কোভিড বিধি মেনে অফলাইনে ক্লাস করানো হয়েছে। সঙ্গে বিনামূল্যে দেওয়া হয় প্রতিটি বিষয়ের ‘স্টাডি মেটেরিয়াল’। 

মোট প্রশিক্ষিত পড়ুয়ার মধ্যে ৫৯৩ জন ছেলেমেয়ে চলতি বছর ওয়েস্ট বেঙ্গল জয়েন্ট পরীক্ষা দিয়েছিলেন। ফল প্রকাশের পর সমীক্ষায় জানা গেছে; চলতি বছরে ৮১,৩৯৩ জন পড়ুয়া রাজ্য জয়েন্ট পরীক্ষায় অংশ নেন। যার মধ্যে সফলতার শীর্ষে রয়েছেন বহু আদিবাসী ও তপসিলি সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরা। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই নির্দিষ্ট দপ্তর আয়োজিত

বিনামূল্য ট্রেনিং করে ৫৩৭ জন পড়ুয়া ইঞ্জিনিয়ারিং ও ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মাসিতে মেধা-তালিকায় রেকর্ড সাফল্য অর্জন করেছেন। 

এখনও পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী (জয়েন্ট এন্ট্রান্স মেইন পরীক্ষা আরও একটি বাকি আছে। এই পরীক্ষা ও নিট পরীক্ষার প্রশিক্ষন এখনো চলছে।);

প্রথম ১০০ জনের মধ্যে সফলতার সঙ্গে জায়গা করে নিয়েছেন ১১ জন। ১০১ থেকে ৪০০০ এর মধ্যে রয়েছেন ২৭২ জন পড়ুয়া। ৪০০১ ও তার পরের মেধা তালিকায় আছেন ২৫৪ জন। 

এই পড়ুয়া ও তাদের অভিভাবক অনেকেই কল্পনা করেছেন তাদের সন্তান জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোক। কিন্তু বাধ সেধেছে আর্থিক দুর্বলতা। সঠিক সুযোগের অভাবে কত মেধাবীর স্বপ্ন অধরাই থেকে গেছে। কিন্তু আজ তা বাস্তব। আদিবাসী মেয়েরাও মেধা তালিকার শীর্ষে জয়গা করে নিয়েছেন। কিছু বছর আগেও যে ভাবনা বিস্বয় ছিল।

বিসিসিআই প্রেসিডেন্ট ও ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়: “সফল ছেলেমেয়েদের জন্য আমার শুভেচ্ছা ও সরকারের এই উদ্যোগকে কুর্নিশ জানাই। বিশেষ করে সমাজের পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায় বলে এখনো যারা সমাজে চিহ্নিত, তারা যে সকলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সফলতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে এটাই উন্নয়নের প্রধান বার্তা। এই ঘটনার সাক্ষী বাংলা থাকত না, যদি রাজ্য সরকারের এই দু’ই দপ্তর নোবেল উদ্যোগ নিত।

  আমি ব্যাক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, যে খেলতে জানে তাকে একদিন সম্মানের সঙ্গে মাঠে ফেরাতেই হয়। সেই মাঠ যে কোনো বিষয় বা পেশার হতে পারে। তবে কেউ যদি লক্ষ্য স্থির রাখে, মনে তেজ ও জেদ থাকে, সঙ্গে অদম্য ইচ্ছে, প্রতিনিয়ত অধ্যাবসায় এবং

সাহস সঙ্গ দেয় তাহলে সুযোগ তার কাছে যে কোনো উপায় আসবেই। তবে সুযোগের সৎ ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ। কৃতী পড়ুয়াদের মনে রাখতে হবে, এই রেজাল্ট জীবনের চূড়ান্ত সফলতা নয়। যাত্রা সবে শুরু হল। পায়ের তলার মাটি শক্ত রেখে টিকে থাকার লড়াইটাই আসল ও অনেক কঠিন এবং চ্যালেঞ্জিং। ততক্ষণ পর্যন্ত থামা যাবে না যতক্ষণ না ভালো কাজের খিদে মিটছে। ভালো ও নিখুঁত কাজ করে যাওয়াটা অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। প্রতিনিয়ত জ্ঞান অর্জন করে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে থাকলে শুধু সাফল্য নয় অর্থ তোমার পিছনে ছুটবে।”

বোর্ড পরীক্ষা ও প্রবেশিকা পরীক্ষার কিছু তফাৎ রয়েছে। যে কোনো প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতি দিতে রাজ্যে প্রচুর বেসরকারি কোচিং সেন্টার রয়েছে। যারা প্রায় লাখ টাকার বিনিময়েও ছেলেমেয়েদের শুধু প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতিই নয়; পড়ুয়াদের মানসিকভাবে প্রস্তুত ও পেশাদারিত্বের প্রশিক্ষনও দেয়। 

কিন্তু সমাজের আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মেধাবী পড়ুয়ারা সঠিক প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণের অভাবে নিজের ও পরিবারের ইচ্ছা পূরণ-এ ব্যর্থ হন। হারিয়ে যান সাধারণের ভিড়ে।

অনেকের ধারণা; উচ্চমাধ্যমিকের প্রস্তুতিই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য যথেষ্ট। এই ধারণা কিছুটা ঠিক হলেও; বিশেষ কিছু টিপস রয়েছে যা কেবল প্রবেশিকা পরীক্ষার জন্যই প্রস্তুত করতে হয়। 

সরকারি এই ট্রেনিং-এ যার কোনোটাই খামতি রাখেনি অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ ও আদিবাসী উন্নয়ন দপ্তর। ছিল ‘মক টেস্ট’ ও ‘ ‘রেসিডেন্সিয়াল ট্রেনিং’ – এর ব্যাবস্থাও। এমনকী ৬ মাসে অনেকবারই মোটিভেশনাল ওয়ার্কশপ করান লাইফ কোচ ও মোটিভেশনাল স্পিকার মৃণাল চক্রবর্তী। তপসিলি ও আদিবাসী ছেলেমেয়েদের অনুপ্রেরণামূলক ক্লাস করানোর প্রসঙ্গে তিনি একান্ত সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, “আমি খুবই কৃতজ্ঞ যে রাজ্য সরকার পিছিয়ে থাকা সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েদের শুধু নয়, এদের মাধ্যমে পুরো পিছিয়ে পড়া শ্রেণীকে মূল স্রোতে আনার দায়িত্ত্ব নিয়েছে এবং ভরসা করে পরীক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা দেওয়ার সুযোগ আমায় দিয়েছেন। নিজের একটা কথা দিয়েই বলি, আমি ছোটবেলায় হকি খেলতাম। পড়াশোনায় তেমন আগ্রহ ছিল না। ফলে বাড়ির সকলেই আমায় নিয়ে চিন্তায় ছিলেন। হঠাৎই একদিন খেলতে গিয়ে পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায়। অপারেশনের পর ডাক্তার জানান, আমি আর আগের মতো খেলতে পারব না। এক নিমেষে আমার জীবনে অন্ধকার নেমে আসে। ভেবেছিলাম জীবনটা এখানেই শেষ। ঠিক সেই সময় আমার জীবনে একজন মানুষ আসেন যাকে আমি গুরু মনে করি। তিনি আমায় একটা প্রশ্ন করেন। ‘তুমি কি জানো তুমি কি জানো না?’ আমি প্রশ্নটা শুনে হতবাক হয়ে বলি, না তো! অবশ্য ভেবেও দেখিনি এই বিষয়ে। তখন তিনি আমায় বলেন, ‘তুমি যা জানো তা হলো জলের একটা বিন্দু। আর তুমি যেটা জানো না সেটা হলো একটা আস্ত সমুদ্র।’ এরপরই আমার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। এই খেলাকে সঙ্গে নিয়েই কিভাবে আমি জীবনের লক্ষ্যে এগাবো সেই চেষ্টা শুরু করে দিই। আমি কেমব্রিজ থেকে ‘ইমোশনাল কোসেন্ট, স্পিরিচুয়াল কোসেন্ট, এনএলপি (ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং) ও স্পোর্টস সাইকোলজি নিয়ে পড়াশোনা ও রিসার্চ করি। তারপর এখন দেশ-বিদেশে কাউন্সেলিং, থেরাপি, মোটিভেশনাল ওয়ার্কশপ, সেমিনার করি। ভারতীয় হকি ও ক্রিকেট দলের সঙ্গেও আমি যুক্ত। একদিন আমিই ভেবেছিলাম জীবনটা শেষ কারণ খেলতে পারব না। একটা বিষয় জীবনকে যে কত রকমভাবে মেলে ধরতে পারে সেটা জানা খুব জরুরী।

মনে রাখতে হবে, যে বোঝে সে খোঁজে। যে খোঁজে সে পায়। আমি শুধু এসসি ও এসটি ছেলেমেয়েদের ক্লাস করানোর সময় নয়; যে কোনো কোর্স, কর্পোরেট অফিস-এ এই ধরনের ক্লাস করানোর সময় তিনটি প্রশ্নের চটজলদি উত্তর প্রথমেই জিজ্ঞাসা করি। এটা অনেকটা কোডিং- এর মতো: 

১. দু’ই আর দু’ই তে কত হয়? সবাই বলে চার।

২. সূর্য পূর্ব দিক থেকে উঠে কি পশ্চিম দিকে অস্ত যায়? সবাই বলে – হ্যাঁ। 

৩. শাহজাহান তাজমহল বানিয়েছিলেন? উত্তর আসে – হ্যাঁ।

এবার আমি এই তিনটি প্রশ্নের উত্তরের উপর ভিত্তি করে ক্লাস শুরু করি।

প্রথম প্রশ্নের উত্তর ২ আর ২ তে তো ২২ ও হতে পারে। আমি তো প্রশ্নে কোথাও যোগ করার কথা বলিনি।

এরপর, সূর্য কি ওঠে ও অস্ত যায়? সূর্য তো ‘কনস্ট্যান্ট ফ্যাক্টর’। পৃথিবীটা ঘুরছে বলে এমনটা হয়।

শেষ প্রশ্নের উত্তরে বলি, শাহজাহান কি সকালে ভেবে বিকেলেই তাজমহল বানিয়েছিলেন? তা তো নয়। কয়েক বছর ধরে তিনি নিজের মনের মধ্যে তাজমহলের প্রতিটি নকশা, কাজ পরিকল্পনা করে তাজমহলের একটা ছবি তৈরি করেছিলেন। তারপর কারিগরদের সেই নকশা বুঝিয়ে বেশ কয়েক বছরের চেষ্টায় তাজমহল তৈরি হয়। যা আজ পৃথিবী খ্যাত।

    আমরা বিশ্বাস আর যুক্তির মধ্যে যে একটা তফাৎ রয়েছে তা বুঝতে পারি না। এই কারণেই ধারাবাহিকভাবে চলতে চলতে নতুন করে ভাবতে পারছি না। আমাদের যে কোনো বিষয়ের গভীরে ডুব দিতে হবে। জানতে হবে একই বিষয়ের মধ্যে কতগুলো আবিষ্কারের পথ রয়েছে। নইলে কোনো বিষয়েরই ব্যপ্তি ঘটবে না। ‘মেন্টাল ক্রিয়েশন’ এর মধ্যে দিয়েই নতুন কিছুর জন্ম হয়। এই বিষয়টা নতুন ও আগামী প্রজন্মকে রপ্ত করতে হবে। ‘ভিজ্যুয়ালাইজেসন পাওয়ার’ বাড়াতে হবে। তবেই নতুন দিন নতুন রূপে সূর্য দেখতে পাওয়া যাবে। সবাই যা দেখে, তোমাকে সেই দেখার চোখে বিস্ময় আনতে হবে।

     তবে আমার মনে হয় এই ধরনের অনুপ্রেরণামূলক ক্লাস একবার বা দু’বার করালে ছেলেমেয়েরা নিজেদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার তাগিদ আয়ত্ত্ব করতে পারবেন না। শুধু এই সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নয়; রাজ্য সরকারের সব দপ্তরের ক্ষেত্রেই প্রতি ৩ মাসে অন্তত একবার এই ধরনের ক্লাস যদি আয়োজন করা যায়, তাহলে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক দিক সবক্ষেত্রেই বাংলার উন্নয়ন ঘটবে।”

সফল কৃতী:

বিষ্ণু ওঁরাও (১৮ তম স্থানাধিকারী), আলিপুরদুয়ার: আমার ছোট থেকেই স্বপ্ন ছিল আমি ইঞ্জিনিয়ার হব। আমরা ৪ ভাই-বোন। দিদি পড়াশোনা করার পর আর্থিক অনটনের জন্য দু’ই দাদা পড়াশোনা করতে পারেনি। মায়ের সঙ্গে দাদা-রা চা বাগানে কাজ করে। বাবা বাড়িতে বাড়িতে ঠিকা কাজ করেন। আমার স্বপ্ন যে এইভাবে বাস্তব হতে পারে আমি বা আমার পরিবার কোনোদিন ভাবিনি। আমি ব্লক থেকে এই ফ্রি কোচিংয়ের কথা জানতে পারি। যোগাযোগ করে ক্লাস শুরু করি। এই ট্রেনিং আমার জন্য ভগবানের আশির্বাদ। প্রতিনিয়ত ক্লাসে বিভিন্ন বিষয় পড়ানোর পাশাপাশি আমাদের এই প্রশিক্ষনও দেওয়া হত যেমন; ১.চিন্তামুক্ত ভাবে কিভাবে পরীক্ষার হলে যেতে হবে। ২.উত্তরপত্রে নাম, রোল নম্বর কিভাবে নির্ভুলভাবে লিখতে হবে। ৩.তিনটি বিষয়ের কোন উত্তরগুলো আগে করে নিলে নির্দিষ্ট সময়ে সফলভাবে পরীক্ষা শেষ করা সম্ভব। ৪.নেগেটিভ মার্কিং এড়ানোর জন্য কিভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। যা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রয়োজন পড়ে না। ৫.কিভাবে চোখের দেখায় চারটি অপশনের মধ্যে থেকে মাল্টিপল চয়েস প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে হয়। ৬. কোন প্রশ্নের জন্য কতটা রাফ কাজ করা প্রয়োজন ইত্যাদি… আমি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জন্য আবেদন করব বিভিন্ন কলেজে।

মিলিকা ওঁরাও (৬৬ তম স্থানাধিকারী), মালবাজার: “আদিবাসী সম্প্রদায়ের মেয়ে হয়েও যে আমি আজ প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ নিতে পেরেছি এবং প্রথম সারির তালিকায় থাকব এমনটা আমি বা আমার পরিবার এমনকি চারপাশের মানুষরাও কোনোদিন ভাবিনি। এখনো আমাদের সমাজ মেয়েরা একটু বড় হলেই বিয়ের ব্যবস্থা করে। গৃহপালিত পশুপালন বা চাষবাসই যাদের জীবন -জীবিকা। প্রথাগত ধারণা ভেঙ্গে এই ‘কমিউনিটি’ থেকে বিশেষ করে মেয়েরা যে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে পারে এটা বাস্তবায়িত করার জন্য আমি ও আমার পরিবার সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ।

আমি নিয়মিত ক্লাস করেছি। রাজ্য সরকারের এই ফ্রি কোচিং আমায় শুধু প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সাহায্য করেছে তা নয়। মনে সাহস জুগিয়েছে লক্ষ্য স্থির রেখে এগিয়ে যাওয়ার। মোটিভেশনাল ক্লাসগুলো আমার জন্য খুবই কার্যকর হয়েছে। শুধু আমি নয়, মেয়েদের জায়গা যে শুধু ঘর গোছানো আর রান্না করা নয়; তা আমার পরিবার ও চারপাশের মানুষকেও বোঝাতে সাহায্য করেছে। প্রতিটি ক্লাসে নতুন বিষয় পড়ানোর আগে আমাদের আগের দিনের পড়া ও কারোর কোনো বিষয়ে জানার থাকলে তা সমাধান করে দিতেন শিক্ষকরা। নানাভাবে আমাদের সকলকে সাহায্য করা হয়েছে যাতে আমরা ভালো করে পড়াশোনা করার পরিবেশ পাই ও সফল হতে পারি। যারা কোনও বিষয়ে একটু পিছিয়ে থেকেছে তাদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়েছে। আমরা যখন চেয়েছি সহযোগিতা পেয়েছি। আমি সর্বভারতীয় নিট পরীক্ষার প্রশিক্ষন নিচ্ছি। আগামীদিনে ডাক্তার হতে চাই।”

ড. অনুত্তমা বন্দ্যোপাধ্যায়, ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট ও কেরিয়ার মেন্টর: “আমাদের দেশে সংরক্ষিত সম্প্রদায় যে পিছিয়ে আছে ও তারা যে পিছিয়েই থাকে এই ধারণা আমরা যেমনভাবেই হোক নিজেদের মধ্যে রপ্ত করে ফেলেছি। আমরা ‘প্রোগ্রেসিভ’ ভাবনা সচরাচর ভাবতে পারি না বা ভাবলেও তার বাস্তব রূপ দেওয়াটা বহুক্ষেত্রে আমাদের কাছে চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়। সম্প্রতি আমরা দেখছি রাষ্ট্রপতি পদের মনোনয়নে আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রার্থী দ্রৌপদী মূর্মুর নাম রয়েছে। ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ঝাড়খন্ডে রাজ্যপাল হিসাবে সফলভাবে দায়িত্ব সামলেছেন। আমরা সবাইকে বাদ দিয়ে ওনাকেই বারবার হাইলাইট করছি ও সংবাদ শিরোনাম-এ আনছি। কারণ আমরা মুখে উন্নয়নের কথা বললেও মননে পুরোপুরি নিজেদের এখনো এগিয়ে নিয়ে যেতে পারিনি। আমাদের এই চেষ্টাটাই করতে হবে। রাজ্য সরকার পিছিয়ে থাকা সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েদের উন্নতির জন্য ‘সবুজ সাথী’ ও ‘কন্যাশ্রী’ দু’টি প্রকল্প জারি রেখেছে। যা রাষ্ট্রসংঘে একাধিকবার শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা জিতেছে। এটা সম্ভব হয়েছে একমাত্র বাংলার ছেলেমেয়েরা এই প্রকল্পকে কাজে লাগিয়ে সব ক্ষেত্রে মাথা উঁচু করে বাকিদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে ও শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক ভাবে সাবলম্বী হচ্ছে বলেই। এই রকম নানা ধরনের বিভিন্ন নতুন উদ্যোগ নেওয়া ও বাস্তবে তার প্রসার ঘটানো দরকার। এই সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েদের ও এই কমিউনিটিকে বোঝাতে ও বিশ্বাস করাতে হবে যে সমাজে কোনো ছোট-বড়, আমরা-ওরার ভেদ নেই। সবার জন্য সুযোগ আছে। এর সঙ্গে ইচ্ছেকে যোগ করলেই আমরা সবাই রাজা।”

ডা. স্পন্দন ভাদুড়ি, প্রফেসর নর্থ বেঙ্গল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল: “হাসপাতালে ডাক্তারি পড়ুয়াদের পড়ানোর সূত্রেই জেনেছি রাজ্য সরকারের দুটি বিত্ত নিগম ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল এসসি, এসটি অ্যান্ড ওবিসি ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ফিনান্স কর্পোরেশন’ ও ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্রাইবাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেটিভ কর্পোরেশন লিমিটেড’ থেকে এসসি, এসটি ও ওবিসি ছেলেমেয়েদের ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং, আইন, ম্যানেজমেন্ট, আইটি সহ বিভিন্ন প্রফেসনাল ডিগ্রি কোর্সের জন্য দেশ ও বিদেশে পড়াশোনার জন্য অত্যন্ত কম সুদ ও সহজ শর্তে এডুকেশন লোন দেয়। বহু ছেলেমেয়ে এই আর্থিক সহায়তায় আজ রাজ্য থেকে দেশ ও বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে সম্মানের সঙ্গে কাজ করছে ও শিক্ষা, অর্থনীতি ও সামাজিক দিক দিয়ে সাবলম্বী হচ্ছে।

তবে এক্ষেত্রে দুটি বিষয়ের দিকে আর একটু নজর দিলে ভালো হয়। বাংলায় বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলে বহু আদিবাসী সম্প্রদায়ের গ্রাম রয়েছে। যাদের প্রতি মুহূর্ত লড়াই করে বাঁচতে হয়। দু’বেলা খাবার জোটাতে কী না পরিশ্রম করতে হয়। এই আদিবাসী ছেলেমেয়েদের চিহ্নিত করতে হবে ও তাদের সমাজের মূল স্রোতে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। জয়েন্টের রেজাল্ট- এই দেখলাম এক আদিবাসী মেয়ে প্রথম ১০০ জনের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। এমনকী যারা এডুকেশন লোন নিয়ে সফলতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে তাদের মাধ্যমে সমগ্র পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের মধ্যে উন্নয়নের বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। নইলে একজন বা দু’জন এগিয়ে আসবে। কিন্তু ‘পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়’ শব্দকে বিলুপ্ত করতে চাইলে এই সম্প্রদায়ের মধ্যে উন্নয়নের বার্তা পৌঁছে দিতে হবে।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

নিজের বৌভাতের অনুষ্ঠানের পরের দিন গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা

প্রদীপ মজুমদার, নদীয়াঃ নদীয়ার নাকাশিপাড়া থানার গাছা এলাকায় নিজের বৌভাতের অনুষ্ঠানের পরের দিন গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করলেন এক যুবক।অসিত ঘোষ(৩২) নামে...

রহস্যজনকভাবে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা

মহঃ শাহজাহান আনসারী, বাঁকুড়া :- রহস্যজনকভাবে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটলো ছাতনার জিড়রা গ্রামে, মৃতার পরিবারের অভিযোগ...

রাজ্য সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভাতারে বিজেপির পথসভা

মনোজ কুমার মালিক,ভাতাড়: চোরদের জেলে ভরো, মমতা গদি ছাড়ো । এই শ্লোগানকে সামনে রেখে ভারতীয় জনতা যুবমোর্চার...

বিয়ের ছয় মাসের মাথাতেই বিষপান করে আত্মহত্যা এক কিশোরীর

প্রদীপ মজুমদার, নদীয়াঃ বাড়ি থেকে পালিয়ে প্রেম করে বিয়ে করে শেষ পর্যন্ত আর বেশি দিন সংসার করা হল না এক কিশোরীর। বিয়ের...