27, Sep-2021 || 04:31 pm
Home জেলা বর্তমানে শিক্ষকতার প্রাসঙ্গিকতা

বর্তমানে শিক্ষকতার প্রাসঙ্গিকতা

সঞ্চিতা সিনহা,বাঁকুড়া: স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন—  ” শিক্ষা মানুষ তৈরি করে”।
   শিক্ষা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসে। মানুষের মধ্যে সুপ্ত সুকুমার প্রবৃত্তি জাগিয়ে তুলতে এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে তাকে  সৃষ্টিশীল কাজে উৎসাহিত করে । শিক্ষা মানুষের মধ্যে  শ্রদ্ধা, ভক্তি, প্রেম, ভালোবাসা এবং অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি সহনশীল হতে ও প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হতে সাহায্যে করে। একমাত্র  প্রকৃত শিক্ষাই মানুষের জীবন দর্শনের কথা বলে। শিক্ষার মাধ্যমেই  মানুষ নিজেকে পরিপূর্ণভাবে সুন্দর রূপে গড়ে তুলতে পারে। তাই কোনো  জাতির উন্নতির প্রধান শর্ত হল তার শিক্ষা আর শিক্ষক হল সেই শিক্ষার সুনিপুণ কারিগর। তাই একজন শিক্ষকেরও কিছু  দায়বদ্ধতা থাকে। শিক্ষকের এই কাজ সমাজের কাছে,দেশ ও জাতির কাছে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ । শিক্ষক শুধুমাত্র জীবনে সফল হতেই শেখান না, সেই সঙ্গে সঙ্গে একজন ভালো মানুষ হতেও শেখান। অর্থাৎ শিক্ষক হলেন সভ্যতার ধারক ও বাহক। শিক্ষক একদিকে যেমন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তৈরি করেন অন্যদিকে তেমনি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকে সমাজকে অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যান।
       মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন তাঁর পুত্রের শিক্ষকের কাছে লেখা একটি পত্রে বলেছিলেন যে, “আমার পুত্রকে জ্ঞানার্জনের জন্য আপনার কাছে পাঠালাম। তাকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন- এটাই আপনার কাছে আমার বিশেষ দাবি।” আবার জগৎবিখ্যাত বীর আলেকজান্ডার তার শিক্ষক এরিস্টটলের প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ বলেছিলেন যে, “To my father, I own my life; to Aristotle, the knowledge to live worthily”।
     প্রাচীনকালে বাংলায় টোল কেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু ছিল যেখানে গুরুর উপদেশ বাণী শুনে শুনে শিষ্যরা মনে রাখত এবং তারা গুরুকে তাদের পথপ্রদর্শক রূপে গণ্য করত । প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলার শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকতা ছিল একটি উৎকৃষ্ট কাজ যেখানে শিক্ষক মহাশয়কে সকল মানবজাতিই সম্মানের চোখে দেখত।
   কিন্তু  বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় শিক্ষকতার প্রাসঙ্গিকতা ক্রমশই হ্রাস পাচ্ছে যার মূল কারণ হল ছাত্র ও শিক্ষকের সম্পর্কের অবনতি।
আজকাল ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষক মহাশয়কে সমীহ ও করে খুব কম। অতীতের ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের মধুর যুগটি আজ স্বপ্নের ন্যায় কোথায় যেন হারিয়ে গিয়ে তা হয়ে উঠেছে কন্টকাকীর্ণ।তার মূল কারণ ছাত্রদের  শাসন করার অধিকার থেকে  শিক্ষকদের আজ বঞ্চিত করা হয়েছে।  আজ প্রত্যেকটি ছাত্রছাত্রীই জানে যদি কোনো শিক্ষক তাদের শাসন করে তবে সেক্ষেত্রে তাদের অভিভাবকরা এসে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।বর্তমানকালে তাই দেখা যায় শিক্ষকরা ছাত্রছাত্রীদের ভয় পেয়ে চলে।
   ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে বর্তমানে  প্রবেশ করেছে কৃত্রিমতা, ব্যক্তিগত স্বার্থ আর লাভের হিসেব। প্রাচীন যুগে ছাত্ররা নিজ হাতে শিক্ষকের পা ধুয়ে দিত। আজ তারা সেই হাতেই শিক্ষককে লাঞ্ছিত করে। আবার শিক্ষক যে হাত দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের আশীর্বাদ করত, সেই হাত দিয়েই আজ কোনো কোনো শিক্ষক কোমলমতি শিক্ষার্থীকে বেত্রাঘাতে ক্ষতবিক্ষত করছে। তাই শিক্ষার্থীরা এখন শিক্ষককে ব্যবহার করতে চায় অসদুপায়ে ভাল ফল লাভের আশায়। অন্যদিকে শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদেরকে ব্যবহার করে অর্থ লাভের এক অভিনব হাতিয়ার হিসেবে। প্রাচীনকালে যেখানে শিক্ষকতা মহান পেশা ছিল বর্তমান কালে তা কিছু  শিক্ষকের কাছে  ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে এখন শিক্ষা নয় স্বার্থের সম্পর্ক বিদ্যমান। ছাত্র শিক্ষক উভয়ই এখন শিক্ষাঙ্গনের রাজনীতিতে যুক্ত। ফলে সেখানেও তাদের মধ্যে রয়েছে আপোসের সম্পর্ক। তবে প্রতিটি ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক এমন নয়, এখনও সৎ শিক্ষক ও ভাল ছাত্ররা আছে। তবে তাদের পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে।
     তবে আমাদের মনে রাখতে হবে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে পিতামাতার সঙ্গে সন্তানদের যেমন নাড়ির সম্পর্ক আছে, ঠিক তেমনি শিক্ষকদের সঙ্গে ছাত্র-ছাত্রীদের আছে আত্মার সম্পর্ক। তাই জ্ঞানহীন মানুষ যদি পশুর সমান হয়ে থাকে তবে একজন শিক্ষকই পারেন সেই মানুষের মনের মধ্যে জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে তাকে প্রকৃত মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে। অর্থাৎ একজন শিক্ষক-ও একজন ছাত্রের মধ্যে সম্পর্ক হতে হবে দিন ও রাত্রির মতো। দিন ছাড়া যেমন রাত্রির কথা ভাবা যায় না, ঠিক তেমনিই শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সুসম্পর্ক ছাড়া জ্ঞানার্জন বিতরণও অসম্ভব। একজন শিক্ষকই শিক্ষার্থীর জ্ঞানার্জনের পেছনে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা জোগায়, স্বপ্ন দেখায়।
   সর্বশেষে  একথা বলা যায় শুধুমাত্র ৫ সেপ্টেম্বর অর্থাৎ ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের জন্মতিথিতে শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন  না করে বছরের প্রত্যেকটি দিনে যদি শিক্ষকদের প্রতি সমমর্যাদা পোষণ করা যায় তাহলে আমাদের দেশ উন্নতির শিখরে খুব দ্রুত পৌঁছে যাবে।শিক্ষার্থীদের জীবনে শিক্ষক মহাশয় দণ্ড স্বরূপ। আর এই দণ্ড ধারণের অর্থ হলো শিক্ষাজীবনে দীর্ঘ পরিক্রমার জন্য প্রয়োজনীয় অবলম্বন। এই দণ্ড শিক্ষার্থী দোষ করলে তাকে শাস্তি দেবে। আবার সেই শিক্ষার্থী ক্ষমা চাইলে তাকে ক্ষমা করবে। যেখানে শিক্ষার্থী নিজেকে অগ্নিকুণ্ডে প্রজ্বলিত করে  আবার  নবীন শিক্ষার্থী রূপে  গুরুর কাছে শিষ্যত্বলাভের আবেদন জানাতে পারবে। 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

সবুজ সাথী প্রকল্পের সাইকেল চুরি করে বেআইনিভাবে বিক্রি করার অভিযোগে বিজেপি এবং তৃণমূলের এক সংঘর্ষ

প্রদীপ মজুমদার, নদীয়াঃ সবুজ সাথী প্রকল্পের সাইকেল চুরি করে বেআইনিভাবে বিক্রি করার অভিযোগে বিজেপি এবং তৃণমূলের এক সংঘর্ষ। গুলি লেগে আহত দুই...

পুলিশের অত্যাচারে হাইকোর্টের শরণাপন্ন কৃষক পরিবার

প্রদীপ মজুমদার, নদীয়াঃ পুলিশের অত্যাচারে হাইকোর্টের শরণাপন্ন কৃষক পরিবার।এরপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়তে থাকায় পুলিশ সুপারের কাছে শরণাপন্ন পরিবার। পুলিশের ভয়ে ও আতঙ্কে...

স্ত্রীর মাথায় কুড়ুল দিয়ে কোপ মেরে হত্যা

মোহাম্মাদ শাহজাহান আনসারী, বাঁকুড়া:- রাগের মাথায় মানুষ কি করতে পারে তার একটি প্রমাণ আজ বাঁকুড়ার শালতোড়া এলাকায় পাওয়া গেল । জানা যায়...