
খাদিমুল ইসলাম বানারহাট:– মাত্র ১৫ বছর বয়স। এই বয়সে একজন কিশোরের স্বপ্ন থাকে পড়াশোনা, বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-আড্ডা আর বাবা-মায়ের স্নেহে বড় হয়ে ওঠার। কিন্তু সেই সব স্বপ্ন এক মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল বিরাজ রায়ের। একদিনের ব্যবধানে সে হারাল তার মা ও বাবাকে। গতকাল উদ্ধার হয়েছিল মায়ের মৃতদেহ, আর আজ মিলল বাবার নিথর দেহ। একমাত্র সন্তান বিরাজ এখন বুঝতেই পারছে না, তার জীবনের পথ কোন দিকে এগোবে। যে ছেলেটি গতকাল সকাল পর্যন্ত বাবা-মায়ের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলেছিল, সন্ধ্যা নামতেই তার জীবনে নেমে আসে গভীর অন্ধকার। একটি হোয়াটসঅ্যাপ ভয়েস মেসেজ মুহূর্তের মধ্যে বদলে দেয় তার পুরো জীবন। সেই বার্তায় বাবা বিমল রায় নিজের স্ত্রীকে খুন করার কথা স্বীকার করেছিলেন বলে পরিবারের দাবি। এরপরই তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ হয়ে যায়। তারপর থেকে আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি তাঁর। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে জলপাইগুড়ি জেলার বানারহাট ব্লকের দুরামারি এলাকার মরাঘাট জঙ্গলের মধুবনী-৩ নম্বর সেকশনে। প্রথমে উদ্ধার হয় চুমকি রায়ের মৃতদেহ। পরে দীর্ঘ তল্লাশির পর উদ্ধার হয় তাঁর স্বামী বিমল রায়ের দেহও। বর্তমানে গোটা ঘটনাকে ঘিরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে এলাকাজুড়ে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুরামারির রাঙাতি এলাকার বাসিন্দা বিমল রায় পেশায় একটি ব্যাটারির দোকান চালাতেন। স্ত্রী চুমকি রায় এবং একমাত্র ছেলে বিরাজকে নিয়ে ছিল তাঁদের ছোট্ট সুখের সংসার। কিন্তু সেই সংসারে দীর্ঘদিন ধরেই অশান্তির আগুন জ্বলছিল। পরিবারের দাবি, স্ত্রীর পরকীয়া সম্পর্কের সন্দেহকে কেন্দ্র করে প্রায়ই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাদ লেগেই থাকত। স্থানীয়দের অভিযোগ আরও গুরুতর। তাঁদের দাবি, বিমল রায়ের নিজের ভাইয়ের সঙ্গেই দীর্ঘ প্রায় দশ বছর ধরে চুমকি রায়ের সম্পর্ক ছিল। এই বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার গ্রামে সালিশি সভাও বসেছিল। স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য রতন রায় জানান, বহুবার বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা হলেও কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও বেড়েছে। বুধবার সকালে চুমকি রায় ও বিমল রায়কে একসঙ্গে মরাঘাট জঙ্গলের নোনাই পার এলাকা পেরিয়ে খট্টিমারি বনাঞ্চলের দিকে যেতে দেখেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ওই সময় দু’জনের মধ্যে বচসাও হয়েছিল। এরপর থেকেই তাঁদের আর দেখা যায়নি। পরিবারের সদস্যরা জানান, কিছুক্ষণ পর বিরাজের কাছে বাবার একটি হোয়াটসঅ্যাপ ভয়েস মেসেজ আসে। সেই বার্তায় বিমল রায় নাকি বলেন, তিনি তাঁর স্ত্রীকে হত্যা করেছেন। এরপরই ফোন বন্ধ হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে পরিবার। খবর দেওয়া হয় পুলিশকে। দিনভর তল্লাশির পর বুধবার সন্ধ্যায় মরাঘাট রেঞ্জের মধুবনী-৩ নম্বর সেকশন এলাকা থেকে উদ্ধার হয় চুমকি রায়ের মৃতদেহ। ঘটনাস্থল থেকে একটি ছোট ছুরি উদ্ধার হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পুলিশের সন্দেহ, ওই ধারালো অস্ত্র দিয়েই চুমকি রায়কে খুন করা হয়ে থাকতে পারে। যদিও এই বিষয়ে এখনও পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে কিছু জানায়নি পুলিশ। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে এলেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা মিলবে। চুমকির মৃতদেহ উদ্ধারের পর থেকেই নিখোঁজ ছিলেন বিমল রায়। গোটা জঙ্গলজুড়ে শুরু হয় জোরদার তল্লাশি। স্থানীয়দের একাংশের ধারণা ছিল, স্ত্রীকে হত্যার পর তিনি হয়তো আত্মহত্যা করেছেন। শেষ পর্যন্ত সেই আশঙ্কাই সত্যি হয়। বৃহস্পতিবার জঙ্গল থেকেই উদ্ধার হয় প্রায় ৪৫ বছর বয়সি বিমল রায়ের মৃতদেহ। চুমকি রায়ের বয়স ছিল প্রায় ৩৮ বছর। একদিনের ব্যবধানে স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় কার্যত ভেঙে পড়েছে দুই পরিবারই। তবে সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় রয়েছে তাঁদের একমাত্র ছেলে বিরাজ। মা-বাবার নিথর দেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। কীভাবে সামনে এগোবে, কোথায় থাকবে, কে তাকে আগলে রাখবে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজ তার কাছেও অজানা। এই হৃদয়বিদারক মুহূর্তে মানবিকতার পরিচয় দেন বানারহাট থানার আইসি সুরাজ থাপা। শোকে ভেঙে পড়া বিরাজকে তিনি বুকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেন। সেই দৃশ্য উপস্থিত বহু মানুষের চোখেও জল এনে দেয়। পুলিশের পোশাকের আড়ালে একজন মানুষের সহমর্মিতার এই ছবি অনেকের মন ছুঁয়ে যায়। বর্তমানে পুলিশ গোটা ঘটনাস্থল ঘিরে রেখেছে। ক্রাইম সিন কর্ডন করে ফরেনসিক তদন্তের কাজ চলছে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। চুমকি রায় ও বিমল রায় দু’জনের মৃতদেহই ময়নাতদন্তের জন্য জলপাইগুড়ি পাঠানো হয়েছে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই মৃত্যুর সঠিক কারণ এবং ঘটনার পূর্ণ সত্য সামনে আসবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এছাড়া ঘটনাস্থলে আজকে উপস্থিত ছিলেন জলপাইগুড়ি জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গ্রামীণ সত্যম ব্যানার্জি। এবং এসডিপিও ধুপগুড়ি অনিরুদ্ধ পাল চৌধুরী তদন্তকারীরা পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলছেন। পারিবারিক অশান্তি, পরকীয়া সম্পর্কের অভিযোগ এবং হোয়াটসঅ্যাপ ভয়েস মেসেজ সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো বিষয়েই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চাইছে না পুলিশ। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় শোকের পাশাপাশি নানা প্রশ্নও উঠছে। একটি সম্পর্কের ভাঙন, দীর্ঘদিনের অশান্তি এবং পারিবারিক দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিল দুটি প্রাণ। আর সেই সঙ্গে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঠেলে দিল একটি নিরপরাধ কিশোরের ভবিষ্যৎ। পরকীয়া, পারিবারিক কলহ কিংবা সম্পর্কের জটিলতা যে কারণই থাকুক না কেন, তার পরিণতি যদি মৃত্যু হয়, তবে হারিয়ে যায় শুধু দুটি জীবন নয়; ধ্বংস হয়ে যায় একটি পুরো পরিবার। বিরাজের কান্না আজ সেই নির্মম বাস্তবতারই সাক্ষী। যে ছেলে গতকাল পর্যন্ত বাবা-মায়ের হাত ধরে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছিল, আজ সে সম্পূর্ণ একা। জীবনের সবচেয়ে কঠিন লড়াই তাকে শুরু করতে হচ্ছে মাত্র ১৫ বছর বয়সে। একটি সুখের সংসারের এমন করুণ পরিণতি শুধু দুরামারি বা বানারহাট নয়, গোটা এলাকাকেই স্তব্ধ করে দিয়েছে। এখন সকলের একটাই প্রার্থনা এই ঘটনার পূর্ণ সত্য দ্রুত সামনে আসুক এবং ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবার যেন এভাবে ভেঙে না যায়।

