02, Dec-2020 || 09:33 pm
Home জেলা কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমা

কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমা

অর্পিতা সিনহা,বাঁকুড়া:(৩০অক্টোবর,২০২০): ভারতবর্ষে বহু প্রাচীনকাল থেকেই লক্ষ্মী পূজার প্রচলন আছে । ঋক বৈদিক যুগে লক্ষীপূজার কোনও সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও ” শ্রী “শব্দের উল্লেখ রয়েছে । যুগ যুগ ধরে লক্ষীকে বিভিন্ন রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। যর্জুবেদে “শ্রী “তথা লক্ষীকে আদিত্যের পত্নী রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। অথর্ব বেদেও উল্লেখ আছে পূর্ন‍্যালক্ষীর। রামায়ণের সীতা কে লক্ষ্মী রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রাচীন ভারতের শিল্পকলায়, মুদ্রায় লক্ষ্মীর অসংখ্য নিদর্শন পাওয়া যায় । হিন্দু পুরাণে কথিত আছে মা লক্ষী সমুদ্ররাজের কন্যা। সমুদ্রমন্থনের সময় আবির্ভাব হয় মা লক্ষ্মীর। তখন থেকেই মা লক্ষ্মী বিষ্ণুপত্নী রূপে সর্বত্র পূজিত হয়ে থাকেন। তিনি স্থিতি শক্তির মাধ্যমে জগতকে সংরক্ষণ ও পালন করেন।লক্ষীদেবী শুধু ধনই নয় আরো বিভিন্ন প্রকার সম্পদ প্রদান করে থাকেন। তিনি খ্যাতি,জ্ঞান,সাহস, জয়, সুসন্তান, সুবুদ্ধি,সৌভাগ্য, উচ্চ ভাবনা,নৈতিকতা, সমস্ত কিছুই দান করেন । বাঙালি হিন্দুদের বিশ্বাস লক্ষী দেবী দ্বিভূজা। অবশ‍্য বাংলার বাইরে লক্ষী দেবী চতুর্ভূজা কমলে কামিনী মূর্তি রূপে পূজিত হন। তাঁর বাহন পেঁচা। প্রতি বৃহস্পতি বারে লক্ষ্মী দেবী আমাদের ঘরে ঘরে পূজিতা হলেও কোজাগরী পূর্ণিমার দিন মহাসমারোহে তাঁর আরাধনা বিশেষ ভাবে করা হয়।
বাংলায় শারদীয়া দুর্গোৎসব এর পর আশ্বিন মাসের শেষে শরৎ পূর্ণিমা তিথিতে যে লক্ষ্মী পূজা করা হয় তাকেই কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা বলে। বাঙালি হিন্দুর ঘরে লক্ষ্মী পূজা এক চিরন্তন প্রথা। হিন্দু শাস্ত্র মতে লক্ষ্মী হলেন ধনসম্পত্তির দেবী।হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী “কোজাগরী “শব্দটি এসেছে ” কো জাগর্তি” থেকে যার অর্থ “কে জেগে আছে “।ভক্তগন বিশ্বাস করেন কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে নাকি দেবী লক্ষী স্বয়ং স্বর্গ থেকে মর্ত‍্যে পরিক্রমায় আসেন। তিনি দেখেন ঐদিন রাতে কেউ জেগে আছে কিনা। যার বাড়ির দরজা বন্ধ থাকে তার বাড়িতে মা লক্ষী প্রবেশ করেন না সেখান থেকে ফিরে যান। তাই কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার রাতে জেগে থাকার রীতি প্রচলিত আছে। সারারাত জেগে ভক্তিচিত্র মনে মা লক্ষ্মীর আরাধনা করাই এই পূজার বিশেষত্ব। মানুষের প্রচলিত বিশ্বাস যে জেগে থাকা ব্যক্তিরাই দেবীর কাছ থেকে ধনলাভের অধিকারী হন । অর্থাৎ ঐ দিন রাতে জেগে যারা অক্ষক্রীড়া করে লক্ষীদেবী তাদের প্রচুর ধন-সম্পদ দান করেন। এই বিশ্বাসের জোরে আমরা দেখতে পাই রাজধানী কলকাতা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের প্রতিটি ঘরেই লক্ষ্মী পূজার আসন পাতা হয়েছে। গবেষকদের মতে বাংলার কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে রয়েছে কৃষি সমাজের গভীর প্রভাব।এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আলপনা প্রথাও। পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে লক্ষ্মী পূজার আলপনায় দেখা যায় আঞ্চলিকতা ছাপ।ঘরের দরজা থেকে শুরু করে ধানের গোলা পর্যন্ত আলপনার ছোট ছোট পায়ের ছাপও দেখা যায় ।লক্ষী পূজা হয় মূলত প্রতিমা, সরা, নবপত্রিকা কিংবা কলার পেটোয় তৈরি নৌকায়। প্রতিমা পূজা ছাড়াও নানাভাবে কল্পনা করে এই দিন তাঁকে পুজো করা হয় যেমন আড়ি লক্ষ্মী,নৌকা লক্ষ্মী। আবার পটচিত্রেও লক্ষ্মী পূজা করা হয়ে থাকে। লক্ষ্মীর সরা হয় নানা রকমের যেমন ফরিদপুরী সরা,ঢাকাই সরা,আচার্যী বা গণক সরা প্রভৃতি। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় লক্ষ্মীর সরা আঁকা হয়। এই সরাগুলিতে কোথাও তিনটি পুতুল,কোথাও পাঁচটি কোথাও সাতটি পুতলের মাধ্যমে লক্ষী, জয়া,বিজয়া,রাধা কৃষ্ণ, সপরিবারে দূর্গার প্রতিমূর্তি আঁকা হয়।কোজাগরী লক্ষ্মীপূজাতে দেখা যায় জেলা ভিত্তিক আঞ্চলিক আচার অনুষ্ঠান । উপচারে ফল,মিষ্টি ছাড়াও থাকে মোয়া, নাড়ু ইত্যাদি। লক্ষ্মীর আচার- অনুষ্ঠানেও দেখা যায় নানা ধরনের তাৎপর্য। কোনও কোনও পরিবারে পূজায় মোট ১৪টি পাত্রে উপচার রাখা হয়। কলাপাতায় টাকা, স্বর্ণ মুদ্রা, ধান, পান, কড়ি, হলুদ ও হরিতকী দিয়ে সাজানো হয় পূজা স্থানটিকে। তারপর লক্ষীর পাঁচালি পাঠ করে মা লক্ষীকে আহ্বান করা হয়। মা লক্ষী পূজোয় ঘণ্টা নিষেধ তাই শুধু মাত্র শঙ্খ বাজিয়ে ধূপ- ধূনা দিয়ে মা লক্ষীর পূজা করা হয়।শঙ্খের মধ্যে দিয়েই মা লক্ষীর আশীর্বাদ ঘরে এসে পৌছায়।কিছু কিছু জায়গায় লক্ষ্মীপূজা উপলক্ষে মেলাও বসে।
এই উৎসবের অন্য আরেকটি দিক হলো কোজাগরী পূর্ণিমার চাঁদ।এইদিন চাঁদ ও পৃথিবী খুব কাছাকাছি আসে।কথিত আছে যে এই চাঁদের আলো নাকি শরীর ও মনকে পরিপুষ্ট করে। এইজন্য ভারতবর্ষের গুজরাট রাজ‍্যের অধিবাসীরা রাতে চাঁদের আলোয় ক্ষীর রেখে পরের দিন খাওয়ার উৎসব পালন করেন । শুধু বাঙালিরাই নয় গুজরাটিরাও এই কোজাগরী পূর্ণিমার দিন গর্বা উৎসব পালন করেন।মহারাষ্ট্রেও ভক্তি সহকারে লক্ষ্মী পূজিতা হন। শুধু পশ্চিমবঙ্গ,মহারাষ্ট্র বা গুজরাতই নয় ভারতবর্ষের প্রতিটি অঞ্চলেই প্রায় লক্ষ্মী পূজার প্রচলন রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

এবার জৌলুসহীন রাস যাত্রা নদীয়ার শান্তিপুরে, হবেনা শোভাযাত্রা, নেই রাই রাজা ও

প্রদীপ মজুমদার, নদীয়া: রাত পোহালেই শান্তিপুরের ভাঙ্গা রাস। আর এই ভাঙ্গা রাস ই এবার জৌলুসহীন। শোভাযাত্রা বন্ধ নেই রাই রাজা ও। নগর...

দুয়ারে দুয়ারে সরকারকে মরণকালে হরিনাম বলে কটাক্ষ করলেন বিজেপি নেতা সায়ন্তন বসু

প্রদীপ মজুমদার, নদীয়া : রাজ্য সরকারের প্রকল্প 'দুয়ারে সরকার' কে মরণ কালে হরিনাম বলে কটাক্ষ করলেন বিজেপি নেতা সায়ন্তন বসু। মঙ্গলবার...

আবেদনের দীর্ঘদিন পরেও উজালা যোজনার গ্যাস সিলিন্ডার না পেয়ে বিক্ষোভ হাসনাবাদে

সৌরভ দাশ, হাসনাবাদ: দীর্ঘদিন আগে উজালা গ্যাস যোজনার গ্যাসের আবেদন করলেও এখনো মেলেনি গ্যাস,এমনকি এলাকার ভারত গ্যাস ব্যবহার কারীরাও সিলিন্ডার ফুরিয়ে গেলে...

টাকী তে সাংগাঠনিক বৈঠক বিজেপি মহিলা মোর্চার

সৌরভ দাশ, টাকী: আসন্ন ভোটে মহিলা মোর্চার স্ট্র্যাটেজি ঠিক করতেমঙ্গলবার বিজেপির রাজ্য মহিলা মোর্চার পরিচালনায় বসিরহাট সাংগাঠনিক জেলার মহিলা মোর্চার উদ্দ্যোগে টাকী...