02, Dec-2020 || 08:25 pm
Home জেলা নারীর ক্ষমতায়ন:

নারীর ক্ষমতায়ন:

অর্পিতা সিনহা,বাঁকুড়া(২৭অক্টোবর): বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানের জয়যাত্রা পেরিয়ে একবিংশ শতাব্দীতে জ্ঞান বিজ্ঞানের আলোকে আজ আমরা অনেকটাই পরিপূর্ণতা লাভ করেছি। সভ্যতার যে অগ্রগতি ও বিকাশ আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি তাতে নারী ও পুরুষ উভয়েই সমান ভাগীদার। নারীকে পিছনের সারিতে রেখে পুরুষের পক্ষে একা পথ চলা কখনোই সম্ভব নয় কারণ মানব জাতির উন্নয়নে নারীদেরও রয়েছে সীমাহীন অবদান।এর প্রমাণ আমরা পাই ঋকবৈদিক সময়কাল থেকেই।ঋকবৈদিক যুগে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার প্রচলিত ছিল। তাই সেই যুগে ঘোষা, অপলা, লোপামুদ্রা, বিশ্ববারা প্রভৃতি নারীরা বৈদিক মন্ত্র রচনা করে বিশ্বজগতে আলোড়ন তুলেছিলেন।পরবর্তী যুগে কৃষিকার্য ও পশুপালন সমাজের মূল অর্থনৈতিক ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ায় অর্থাৎ সমাজ ও অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসার ফলে নারীর ক্ষমতা কমতে থাকে।কিন্তু তাসত্ত্বেও গার্গী, মৈত্রেয়ীর মতো ব্রহ্মবাদিনী নারীরা অদম্য জেদ এর পরিচয় দিয়ে বিশ্ব দরবারে নিজেদের নাম উজ্জ্বল করে গেছেন। বর্তমানকালেও সমাজের অগ্রগতিতে চাকা সচল করতে নারীরা সক্ষম হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মিসাইল ওম‍্যান নামে পরিচিত প্রথম মহিলা বিজ্ঞানী টেসি থমাস এর কথা বলতেই হয়।তিনি অগ্নি ৪ এবং অগ্নি ৫ মিশাইল এর অধিকর্তা হিসাবে কাজ করেন।

বর্তমান কালে নারীর ক্ষমতায়ন এই কথাটি নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে।কিন্তু অনেক আগে থেকে বহু সাহিত্যিক তাঁদের লেখনীতে নারীর ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠার কথা বলে গেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম কয়েক দশক আগেই তাঁর কবিতায় ক্ষমতায়ন ও নারীর সমানাধিকার কথা বলেছিলেন। তিনি তাঁর কবিতার বলেছিলেন ” সাম্যের গান গাই/ আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই /বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর/ বিশ্বে যা-কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি /অর্ধেক তার আনিয়াছে নর অর্ধেক তার নারী /”।
নারীর ক্ষমতায়ন বলতে বোঝায় নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীনতা ও নিজস্বতার বুদ্ধি বর্ধক বিকাশ কে।নারী যদি তার নিজের জীবনে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীন হয় এবং নিজের কাজের জায়গায় নিরাপদে থাকতে পারে এমন পরিবেশ যদি থাকে তাহলে সেই পরিবেশকে নারীর ক্ষমতায়নের উপযোগী বলা যেতে পারে।প্রকৃতপক্ষে এই ক্ষমতায়ন আসে মন থেকে।নারী ও পুরুষ উভয়ের যদি সমান ভাবে এগিয়ে আসে তাহলে নারীর ক্ষমতায়নের কোনো বাধা থাকবে না।

সমাজে সাফল্যের পেছনে নারীর অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু তাদের এই অগ্রগতির ধারা কে রুখে দিতে তৎপর পুরুষশাসিত এই সমাজ।মেয়েদের নিজস্ব ক্ষমতা রয়েছে, তাদের সম্মান রয়েছে, তাদের আলাদা নিজস্ব জগত আছে এই চিরাচরিত সত‍্যগুলো কে পুরুষ শাসিত সমাজ চিরকাল তাচ্ছিল্য করে এসেছে।আজ থেকে প্রায় দুহাজার তিনশ বছর আগে আরিস্টটল বলেছিলেন যে নারীরা পুরুষের তুলনায় দূর্বল ও স্বল্প বুদ্ধি সম্পন্ন।অ‍্যারিস্টটলের এই কথাকে পুরুষরা অনুসরন করেছে কালের পর কাল ধরে।নারীদের নিজস্ব ক্ষমতাকে প্রষ্ফূটিত করতে না দিয়ে তাকে অন্দরমহলের চার দেওয়ালে আটকে রাখতে আগ্রহী এই সমাজ।শুধু অশিক্ষিতরাই নয়, শিক্ষিত ব‍্যাক্তিরাও নিজেদের পশ্চাৎমুখী চিন্তাধারায় আড়ষ্ট হয়ে নারীদের সৃজনশীলতায় বাধার সৃষ্টি করছে।তাই জন্মের পর থেকেই নারীকে পরিবারের বোঝা বলে মনে করে তাকে নির্যাতন ও অবহেলা করা হয়।পুরুষশাসিত এই সমাজে নারীদের বলা হয় তারা দূর্বল তাই পুরুষদের উপর নির্ভর করে তাদের জীবন যাপন করতে হবে।সেইজন‍্য হয়তো মেয়েরা আজও নিজের পরিচয় গড়ে তুলতে অপারগ।কৈশোরে সে বাবা,যৌবনে স্বামী এবং বৃদ্ধ বয়সে পুত্রের উপর নির্ভরশীল। আজও নারীকে সতীত্ব প্রমাণে পরীক্ষা দিতে সীতার মতো ।এই প্রসঙ্গে বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের কথা বলতেই হয় তিনি বলেছিলেন যে” স্ত্রীলোকদের উপর যেমন কঠিন শাসন পুরুষেদের উপর তেমন কিছুই নেই কথায় কিছু হয় না।ভ্রষ্ট পুরূষের কোনো সামাজিক দন্ড নেই।একজন স্ত্রী সতীত্ব সম্পর্কে কোনো দোষ করলে সে আর মুখ দেখাতে পারে না”। নিজের অধিকার সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে নারী কে পুরুষের উপর নির্ভর করে থাকতে হয় সে কোন প্রতিবাদ করতে পারে না। নারী ঘরের কাজ করবে বাইরের কাজ করতে পারবে না এই বৈষম্যমূলক চিন্তাধারার জন্য নারীকে ছোটবেলা থেকে পর্যাপ্ত শিক্ষা দেওয়া হয় না ফলে নারীর ক্ষমতা বাধাপ্রাপ্ত হয়। আবার যেখানে নারী-পুরুষ উভয়েই অর্থ রোজগার করে সেখানে উভয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে। যার ফলে নারী তার ক্ষমতার বিকাশ ঘটাতে সম্ভবপর হয় না।নারীকে পুরুষের প্রতিবন্ধক মনে না করে যদি সহকর্মী মনে করা হয় তাহলে হয়তো ক্ষমতায়ন কথাটি বাস্তবায়িত করা সম্ভব হতে পারে।নারীকে তার অধিকার বুঝিয়ে দিয়ে কুসংস্কার মুক্ত করতে পারলে নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব।নারীকে বিজ্ঞাপনের পণ্য বা ভোগ‍্যবস্তু না ভেবে যদি মানুষ বলে ভাবা যায় তাহলে হয়তো ক্ষমতায়নের পথে কোনো অন্তরায় থাকবে না।
সংবিধানে বলা আছে নারী পুরুষের সমান অধিকারের কথা। কিন্তু বাস্তবে নারীরা তাদের পূর্ণ অধিকার পায় না। যদিও নারীর ক্ষমতায়নে সারাবিশ্ব স্বতন্ত্রভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে এই ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে এসেছে বিশ্ব জাতিসংঘ সংগঠন।নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর সম্মান ও নারী শ্রমের মূল‍্যায়নের লক্ষ্যে জাতিসংঘ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে । ১৯৭৫ সালকে নারী বর্ষ ও ১৯৭৫-১৯৮৫ সালকে নারী দশক ঘোষণা করা ছাড়াও জাতিসংঘ সংগঠন বিশ্ব নারী সম্মেলনর আয়োজন করেছিল। সামাজিক,অর্থনৈতিক রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক ইত্যাদি নানা বিষয়ে নারীরা যাতে পূর্ণ অধিকার পায় সেইজন্য তাদের উৎসাহিত করা ছিল এই সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য।

পুরুষেরা আজ ও তোতা পাখির মত আউরে যেতে পারে যে তাদের ছাড়া নারীরা এক পাও চলতে পারবে না। কিন্তু সত্যিই কি তাই? আজ নারীরা পুরুষের এই চোখ রাঙানি কে উপেক্ষা করে সমস্ত রকম প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে এভারেস্টের চূড়ায়,শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে, খেলাধুলায়,গবেষণার ক্ষেত্রে,আইনজ্ঞ হিসাবে বা বৈজ্ঞানিক হিসাবে সাফল্যের পরিচয় দিচ্ছে। তাই তো আজ সুনিতা উইলিয়ামস চাঁদের মাটিতে পা রাখতে পেরেছেন বা কল্পনা চাওলা মহাকাশ অভিযান করতে পেরেছেন। এমনকি বর্তমানে নারীরা সিঙ্গেল মাদার হওয়ার সাহসিকতাও দেখিয়েছে। বর্তমানে নারীরা এগিয়েছে অনেক কিন্তু তাদের পথ চলা এখনোও অনেক বাকি। তাই শেষ করতে চাই একালের এক নারীর দীপ্ত কণ্ঠের প্রতিধ্বনিকে নিয়ে তার কথায় “অবমাননা থেকে মুক্তির দায়িত্ব নারীকে নিজেই নিতে হবে। অচেতন জড়ত্বের অবমাননা থেকে বেরিয়ে এসে পালন করতে হবে সচেতন অস্থিত্বের ভূমিকা।হোক সে ভূমিকা সঙ্ঘাতময়,হোক সে ভূমিকা আত্মকেন্দ্রিক, প্রজাতির প্রতি পরিপূর্ণ নিবেদন থেকে অব্যাহতি নিয়ে ব্যক্তিগত বিকাশে মনোযোগী হতে হবে। সমতুল্য হয়ে উঠতে হবে সচেতন অস্তিত্বের।মুছে ফেলতে হবে অমর্যাদার চিহ্ন।”


LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

এবার জৌলুসহীন রাস যাত্রা নদীয়ার শান্তিপুরে, হবেনা শোভাযাত্রা, নেই রাই রাজা ও

প্রদীপ মজুমদার, নদীয়া: রাত পোহালেই শান্তিপুরের ভাঙ্গা রাস। আর এই ভাঙ্গা রাস ই এবার জৌলুসহীন। শোভাযাত্রা বন্ধ নেই রাই রাজা ও। নগর...

দুয়ারে দুয়ারে সরকারকে মরণকালে হরিনাম বলে কটাক্ষ করলেন বিজেপি নেতা সায়ন্তন বসু

প্রদীপ মজুমদার, নদীয়া : রাজ্য সরকারের প্রকল্প 'দুয়ারে সরকার' কে মরণ কালে হরিনাম বলে কটাক্ষ করলেন বিজেপি নেতা সায়ন্তন বসু। মঙ্গলবার...

আবেদনের দীর্ঘদিন পরেও উজালা যোজনার গ্যাস সিলিন্ডার না পেয়ে বিক্ষোভ হাসনাবাদে

সৌরভ দাশ, হাসনাবাদ: দীর্ঘদিন আগে উজালা গ্যাস যোজনার গ্যাসের আবেদন করলেও এখনো মেলেনি গ্যাস,এমনকি এলাকার ভারত গ্যাস ব্যবহার কারীরাও সিলিন্ডার ফুরিয়ে গেলে...

টাকী তে সাংগাঠনিক বৈঠক বিজেপি মহিলা মোর্চার

সৌরভ দাশ, টাকী: আসন্ন ভোটে মহিলা মোর্চার স্ট্র্যাটেজি ঠিক করতেমঙ্গলবার বিজেপির রাজ্য মহিলা মোর্চার পরিচালনায় বসিরহাট সাংগাঠনিক জেলার মহিলা মোর্চার উদ্দ্যোগে টাকী...