29, Oct-2020 || 01:40 pm
Home বিনোদন কমিক্স ও গ্রাফিক্স-এর চতুর্থ পর্ব

কমিক্স ও গ্রাফিক্স-এর চতুর্থ পর্ব

ঋদ্ধি ভট্টাচার্য,কোলকাতা:- এ এক আশ্চর্য টাইম মেশিন। আপনার অজান্তে আপনি ফিরে যাবেন সেই অনাবিল ছেলেবেলায়। সেই পাড়ার ছোট্ট পার্ক বা এক চিলতে খেলার মাঠ, লাল-নীল ঘুড়ি, বরফ-কাঠি আইসক্রিম, ইস্কুল ঘর ও মিষ্টি দিদিমণি, বৃষ্টিভিজে খালি গায়ে ফুটবল ম্যাচ, রেডিওতে অনুরোধের আসর, স্টিরিওতে কিশোর কুমার,সিনেমা হলে অমিতাভ-রেখা, স্কুলের সামনের ঘুঘনি, আচার, হজমি, লুকিয়ে টানা প্রথম সিগারেট, প্রথম প্রেমের চিঠি। জীবন আকাশে আবার ভেসে ভেসে আসে পুঞ্জ পুঞ্জ বর্ষার মেঘ, ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে ভিজছে আপনার দগ্ধদিন, এক মনোরম বর্ষণ।এক সুখকর অবগাহনে জুড়িয়ে যাচ্ছে আপনার সর্বাঙ্গ।

সামনে খুলে রাখা ছবিতে ছবিতে ভরা বইটার পাতা উদাসী বাতাসে ফরফর করে আপনাআপনিই উল্টে যাচ্ছে।বইয়ের পাতা থেকে মুখ তুলে আপনি আকাশের দিকে তাকিয়ে- আপনি ফিরে যাচ্ছেন দূরে দূরে বহুদূরে! অনেক অনেক উজান বেয়ে আপনার সেই মনোরম নিষ্পাপ কিশোরবেলায়! “কমিক্স ও গ্রাফিক্স”-এর পাতায় পাতায় উঠে আসছে সেই ছবিতে গল্প আর গল্প ছবি বিস্তারিত সব তথ্য গুলি। গত তিনটি সংখ্যার মত এই সংখ্যাটি তুলে ধরা হয়েছে মোট ২৬-টি প্রবন্ধ এবং তিরিশটি ভিন্নস্বাদের কমিক্স ও গ্রাফিক্স সংক্রান্ত বিস্তারিত প্রবন্ধ।
প্রথমত বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় কে এবং শ্রী সত্যজিৎ রায় কে স্মরণ করে তাদের সৃষ্টি ‘পথের পাঁচালী’-র একটি গ্রাফিক্স নভেল ফুটিয়ে তুলেছেন গৌতম কর্মকার। তার পরেও ফুটে উঠেছে বাটুল দি গ্রেট এর একটি সংলাপের ছিদ্র কিছু একত্রে সুমিত সেনগুপ্ত দৌলত। অরণ্যদেব বা ব্যাটসম্যানদের মতন সুন্দর সমস্ত কার্টুনের প্রেক্ষাপট যেমন আগের সংখ্যাগুলোতে ফুটে উঠেছে ঠিক সেইভাবেই অলক দাশগুপ্ত এবং ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা ফুটে উঠেছে ‘স্বপ্নসুন্দরী জাদুকর’ ও ‘ম্যানড্রেকের অবাক দুনিয়ার’ উপর বিস্তারিত প্রবন্ধ। বাংলায় প্রবাদপ্রতিম কার্টুনিস্ট চন্ডী লাহিড়ী কাজকর্ম ওপর একটি বিশেষ ভাবে লিখেছেন সুশান্ত রায় চৌধুরী এবং ত্রিলোক নাথ। রাজশ্রী সরকারের অধ্যাবসায় উঠে এসেছে প্রাণের সৃষ্টি চাচা চৌধুরী ইতিবৃত্ত যার সারা ভারতে প্রচন্ডভাবে হয়ে উঠেছিল একটি আট থেকে আশির কোম্পানীয়ন হয়। তাছাড়া ফুটবলে উপর বিশ্বে নানা ধরনের কমিক্সের বই, কমিক স্ট্রিপ ইত্যাদির ওপর একটি বিশেষ প্রবন্ধ রচনা করেন বিবেক সেনগুপ্ত যা ফুটবলপ্রেমীদের প্রতি আকর্ষণ করে তুলবে। সারা বিশ্বের কাছে হারজ পৌঁছে দিয়েছিল বেলজিয়ামের এক সত্যান্বেষী ওরফে গোয়েন্দা টিনটিন কে। সেই টিনটিন অলংকরণ করার সময় স্রষ্টার সাথে ববি মুর এর সুন্দর সম্পর্ক এবং বহু দুষ্প্রাপ্য সমস্ত কমিক স্ট্রিপ তুলে ধরেছেন অভিজিৎ সুকুল। এছাড়াও বাঙালি শিল্পী শঙ্খ বন্দোপাধ্যায় অতি নবীন বয়সে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি এবং তার গুণের কদরে বিশ্ব কমিক্স-এর সম্বলনে ভারতকে তুলে ধরার যে অসম্ভব প্রয়াস এবং তার যাত্রা পথের সব কিছুর ব্যাপারে তুলে ধরা হয়েছে এই পত্রিকার। ঘনাদা কমিক্স-এর প্রেক্ষাপট এবং ডন মার্টিন এর উপর আলোচ্য সত্যিই নজরকাড়া। কমিক্স যে একটি শিশু সাহিত্য সেটি প্রথম উল্লেখ করেছিলেন বাংলা প্রবাদ প্রতিম কমিক শিল্পী শ্রী নারায়ন দেবনাথ যা নিয়ে বহু আলোচনা শুরু হয়েছিল মানুষের মধ্যে। মূলত সেই আলোচনা বিষয়কে রেখে সেটা আদৌ শিশুসাহিত্য হিসেবে তুলনা করা যায় কিনা সে ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন শ্রী কৌশিক মজুমদার। কমিকস বিস্ময়ের শেষ ভাগে উঠে এসেছে সৌরভ চক্রবর্তী ‘ডেনিস দ্য মেনেস’। এ বিষয়ে কমিক্সটি যখন প্রকাশ পায় তখন একই সময় এবং একই দিন,একই নামে একটি বিলেত এবং একটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশ পায়। কিন্তু কীভাবে এমন কাকতালীয় ঘটনা সম্ভব তা আজও কমিক্স প্রেমীদের কাছে একটি বিস্ময়কর চিহ্ন রয়ে গেছে। এসমস্ত কমিক্স বিষয়ক আলোচনা ছাড়াও পাতায় পাতায় ভরে উঠেছে বিভিন্ন বাংলা কমিক্স এবং অনুবাদ করা প্রচুর বিলেত ফেরত কমিক্সের মরীচিকা। বাংলা কমিক্স এর মধ্যে আছে যেমন ‘চাঁদনী রাতে মরীচিকা’, ‘পাগলু চরিত’, ‘খুদে বৈজ্ঞানিক’, ‘অসুর’ এবং চণ্ডী লাহিড়ী সৃষ্টি আজগুবি, বাগেশ্রী, সঙ্গদোষ ও বাঙালির খোঁজে। বিলেত ফেরত এর মধ্যে মূলত ভরে উঠেছে ‘লরেল এন্ড হার্ডি’, ‘টাইম মেশিন’, ‘বিশ্বজোড়া বিদ্যালয়’, ‘সুপার স্টিভ’, ‘কুলু আর টুলু’ সহ আরো অনেক কিছু।

এবার আসা যাক ‘গ্রাফিক্স’ এর উপর মানে ছবিতে গল্প। এখানে মূলত ভিন্ন স্বাদের প্রবন্ধ মাধ্যমে সম্মান জ্ঞাপন এবং গ্রাফিক্স এর মূল বিষয়কে তুলে ধরেছে এই পত্রিকা। মূলত বিয়ে কার্ডে কার্টুন ছবি দিয়ে যে বানানো যায় তার একটি আশ্চর্য প্রদর্শনী যেন এখানে উঠে এসেছে। এই গ্রাফিক্স বিষয়ে বিশ্বে প্রথম উঠে আসে পাল্প দুনিয়ায় কথা যেটি ১৯২০ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে খুব রমরমা হয়েছিল। এই পাল্প দুনিয়ার ৫ নক্ষত্র কে সম্মান দিলেন কমিক্স ও গ্রাফিক্স পত্রিকা। তারা হলেন জর্জ উইলসন,জন ডিউলো, এলেইন ডিউলো- যাদের সারাবিশ্ব পাল্প দম্পতি বলে চেনে, উইল হালসি-যাকে বাংলার কমিক্স স্রষ্টা ময়ূখ চৌধুরির সাথে তুলনা করা হয় এবং মর্ট কুনস্টলার। এদের সমস্ত কাজের বিষয়কে মূলত তুলে ধরা হয়েছে এবং তাছাড়াও রবার্ট ম্যাকগিনিস এর পাল্প কভার-এর উপর মূলত তুলে ধরা হয়েছে। এই দুই শ্রদ্ধা জ্ঞাপন মূলত সম্ভব হয়েছে অয়ন রাহা এবং কৌশিক মজুমদার এর জন্য।
শুধু এখানেই শেষ সেটা নয়, এছাড়াও এখানে আছে হেভি- মেটাল এবং মন্দার মল্লিক- এর উপর একটি বিশেষ আলোচনা। তিনি প্রথম দিনই বাংলাকে অ্যানিমেশন ফ্লিম উপহার দিয়েছিলেন ও বহু অ্যানিমেশন সংক্রান্ত কাজের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে ধ্যান করা যেতে পারে। সর্বশেষে একটি আলোচনার বিষয় উল্লেখ না করলেই নয় যার সঙ্গে পুরোপুরি ভাবে ডুবে আছে বাংলা ও বাঙালিরা। এটি হলো সমুদ্র বসুর কলমে উঠে আসা লেখায় শির্ষেন্দু রেখায় দেবাশীষ- যেখানে বাংলা সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখা বিভিন্ন গল্পের অলংকরণ এবং প্রচ্ছেদ করেছেন শ্রী দেবাশীষ দেব। এই প্রবন্ধের মাধ্যমে উঠে এসেছে বাংলা আরো দুই জুটির কথা যাদের মধ্যে প্রথম হলেন শিবরাম চক্রবর্তী ও শৈল চক্রবর্তী এবং যতীন্দ্র কুমার সেন ও রাজশেখর বসু যাকে মূলত আমরা পরশুরাম বলেই চিনে থাকি। এদের এই প্রয়াশকে কুর্ণিশ জানাতে এগিয়ে থাকুক সারা ভারতবর্ষের আনাচে কানাচে থাকা সমস্ত বাঙালিরা।

বিগত তিনটি সংখ্যার প্রতিটি পৃষ্ঠাতেই “কমিক্স ও গ্রাফিক্স” প্রমাণ করে ছেড়েছে কেন এই মুহূর্তে দেশে তো বটেই সারা বিশ্বেও এমন ম্যাগাজিন খুব একটা বেশী নেই। প্রতিটি সংখ্যার পেছনেই ব্যাপক পড়াশোনা, অনুসন্ধান, পরিশ্রম এবং নিষ্ঠার ছাপ তার সর্বাঙ্গে। কমিকস, গ্রাফিক নভেল এবং গ্রন্থ প্রচ্ছদ-অলংকরণের ইতিহাস, গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ, বিরল এবং দুষ্প্রাপ্য ছবি, সেই শুরু থেকে একদম হাল আমলের শিল্পীদের উজ্জ্বল সৃষ্টির ঝলমলে ছবিতে সেজে অপরূপ সজ্জিতা একেকটি সংখ্যা। দেশের প্রতিথযশা শিল্পীদের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে বিশদ আলোচনা , শিল্পীদের সাক্ষাৎকারে একেকটি সময় এবং সমাজের একটি নিখুঁত খণ্ডচিত্র প্রতিবিম্বিত হয়।

এটা স্বীকার করতেই হবে বুকফার্ম -এর “কমিক্স ও গ্রাফিক্স”র প্রতিটি সংখ্যাই মূলত “কালেক্টরস আইটেম” কিন্তু সঙ্গে এটাও অনস্বীকার্য যে এই বই কেবল হাড়িমুখো বিদ্যের জাহাজ বাবুমশাইদের মুখেই হাসি ফোটায় না সাধারণ পাঠকের কাছেও এই বইয়ের আকর্ষণ এবং জনপ্রিয়তা বিস্ময়কর। ইন্দ্রজাল কমিকসের পর আম-বাঙালিকে এমন কমিকসমুখো করতে আর কোন বই পারেনি। এবার পঞ্চম পর্ব টি নিয়ে একটু ভাবনা চিন্তা করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সমস্ত কমিক্স-প্রেমীদের কাছে তাঁর একটি আশ্বাস নিয়ে অধির আগ্রহে তাকিয়ে আছে আপামর বাঙালিরা বুক ফার্ম-এর দিকে চেয়ে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল-এর জন্মতিথি থেকে আহমেদাবাদ ও কেভাডিয়া-র মধ্যে চালু হচ্ছে সিপ্লেন পরিষেবা

হীরক মুখোপাধ্যায় (২৮ অক্টোবর '২০):- আগামী ৩১ অক্টোবর সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল-এর জন্মতিথিকে স্মরণে রেখে আহমেদাবাদ-এর 'সবরমতী নদী' থেকে গুজরাতে অবস্থিত কেভাডিয়া-র 'স্ট্যাচু...

প্রতিবাদ দিবস পালন করতে গিয়ে তৃণমূলী দুষ্কৃতীদের আক্রমণের শিকার ভারতীয় মজদুর সংঘ-র প্রদেশ নেতৃত্ব

হীরক মুখোপাধ্যায় (২৮ অক্টোবর '২০):- কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রমিক বিরোধী নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে আজ পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রাম অঞ্চলে তৃণমূল কংগ্রেস...

অবস্থান বিক্ষোভ শ্রমিকদের

মলয় সিংহ, বাঁকুড়া :একাধিক দাবি দাওয়া নিয়ে বাঁকুড়ার বড়জোড়া ব্লকের হাটআসুড়িয়ায় কালিমাতা ভেপার প্রাইভেট লিমিটেড নামে রেলের যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানার সামনে অবস্থান...

নারীর ক্ষমতায়ন:

অর্পিতা সিনহা,বাঁকুড়া(২৭অক্টোবর): বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানের জয়যাত্রা পেরিয়ে একবিংশ শতাব্দীতে জ্ঞান বিজ্ঞানের আলোকে আজ আমরা অনেকটাই পরিপূর্ণতা লাভ করেছি। সভ্যতার যে অগ্রগতি ও...