29, Oct-2020 || 12:58 pm
Home বিনোদন অযান্ত্রিক অভিযানে ট্যাক্সি ড্রাইভার

অযান্ত্রিক অভিযানে ট্যাক্সি ড্রাইভার

ঋদ্ধি ভট্টাচার্য, কোলকাতা:- আমাদের বাংলা চলচ্চিত্রে ট্যাক্সি ড্রাইভার খুব চেনা জানা একটি চরিত্র, হয়তো আমাদের প্রতিবেশী, যে কিনা প্রধান চরিত্র হিসেবে বিশেষভাবে বাংলা চলচ্চিত্রে স্থান পেয়ে এসেছে । সে চেনা জানা মোটরগাড়ির চালককে নিয়ে আমাদের বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম পুরোধা চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক কুমার ঘটক ও সত্যজিৎ রায়ের যথাক্রমে বিখ্যাত দুটি চলচ্চিত্র রয়েছে। ঋত্বিক ঘটকের আযান্ত্রিক (১৯৫৮) ও সত্যজিৎ রায়ের অভিযান (১৯৬২)। একজন চলচ্চিত্র প্রেমী হিসেবে ‘মোটরগাড়ি চালক’ চরিত্রের কথা উঠতেই ইতিমধ্যে মার্টিন স্করসেসির কানের ‘পাল্ম ডি`অর’ জয়ী কাল্ট ক্ল্যাসিক ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার'(১৯৭৬) চলচ্চিত্রের কথা আপনার স্মরণে এসে গেছে । চলুন এই তিন ‘মোটরগাড়ি চালক’ নিয়ে অল্পবিস্তর জানা যাক –

বাংলার অন্যতম দুই চলচ্চিত্রকারের দুটি চলচ্চিত্র ও মার্টিন স্করসেসির ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’ নিজস্ব গল্প ও নির্মাণ স্বকীয়তায় অনন্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না । ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’ নির্মাণে ‘ট্রাভিস বিকেল’ চরিত্র বাছাই ও মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তিতে ‘অভিযান’ এর প্রভাব স্পষ্ট, সত্যজিত রায়ের জন্ম বার্ষিকী উপলক্ষে ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়ার’ এক সাক্ষাৎকারে তার চলচ্চিত্রে ‘অভিযানে’ র প্রভাব নিয়ে মার্টিন স্করসেসি বলছিলেন,

‘‘My first view of Satyajit Ray was at the Cannes Film Festival, somewhere in the mid-70s. I had grown up watching his classics, the Apu trilogy, Devi, Mahanagar and Charulata. Each appeared a classic unparalleled to me. In sheer terms of content and cinematic excellence.”

ট্যাক্সি ড্রাইভার’ নির্মাণে ‘অভিযান’ সহ সত্যজিৎ রায়ের কাজ যে স্করসেসিকে অনুপ্রেরনা যুগিয়েছে তা স্পষ্টতই অনুধাবনীয় ।

এখন যদি আসে ঋত্বিক ঘটকের অযান্ত্রিক ও সত্যজিৎ রায়ের অভিযানের কথা, তবে দেখা যাবে এই দুই চলচ্চিত্রের মধ্যকার বিশেষ মিল রয়েছে । অযান্ত্রিকের ‘বিমল’ (কালি ব্যানার্জি অভিনীত) ও অভিযানের ‘নরসিং’ (সৌমিত্র চ্যাটার্জি অভিনীত) যেন একটি চরিত্রেই তাঁরা আলাদা চলচ্চিত্রে দুই প্রেক্ষাপটের কথা বলছে। আমরা এই ট্যাক্সি ড্রাইভারদের পরিবারকে চিনি না, সমগ্র গল্প জুড়েই বিমল, নরসিং একা ! একদিকে অযান্ত্রিকের বিমলের পরিবার বলতে কেউ নেই, চলচ্চিত্রে শিশু চরিত্র সুলতানের সাথে বিমলের কথাবার্তায় জানতে পারি পনের বছর আগেই তার মা মারা গেছে, অন্যদিকে অভিযানের নরসিং একা-ভবঘুরে মানুষ, তারও মোটরগাড়ি ছাড়া আর কিছু নেই । বিমল ও নরসিং দুজনেই সরাসরি ভাবে মোটরগাড়ির উপর নির্ভরশীল। তাঁদের জীবন যেন মোটর গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তাঁদের মোটরগাড়ি স্বাধীন চরিত্র ।
সাহিত্যিক সুবোধ ঘোষের ছোট গল্প ‘অযান্ত্রিক’অবলম্বনেই ঋত্বিক ঘটক একই নামে নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র অযান্ত্রিক (১৯৫৮)। ডার্ক-কমেডি ধাঁচের চলচ্চিত্র অযান্ত্রিকে জগদ্দলের (মোটরগাড়ির ডাকনাম) অভিব্যক্তি প্রকাশে শব্দের ব্যবহার অভূতপূর্ব নাটকীয়তার সৃষ্টি করে ,অনেক সময় সরাসরি জগদ্দলকে দেখা যায় বিমলের প্রশ্নের উত্তর দিতে ! কখনো কখনো জীবন্ত হয়ে জগদ্দল বিমলকে ছাড়িয়ে প্রধান চরিত্র হয়ে উঠেছে ,এমনও মনে হতে পারে বিমলকে নিয়ন্ত্রণ করছে তার গাড়ি ‘জগদ্দল’। চলচ্চিত্রের শেষ দিকে এসে জগদ্দলের বিদায় ও বিমলের মানসিক পরিস্থিতি তাঁদের আত্মিক সম্পর্কের জানান দেয় নিঃসন্দেহে।

অযান্ত্রিকের চার বছর পর, ১৯৬২ সালে তাঁরাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় রচিত উপন্যাস ‘আভিযান’ অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্র তৈরি করেন । পূর্বেই জেনেছি বিমলের মতো ট্যাক্সি ড্রাইভার নরসিং ছিলো সেই চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র । এখানে বলে রাখা ভালো, অযান্ত্রিক দেখার পর যদি অভিযান দেখেন তবে বাংলার আরেক খ্যাতিমান পরিচালক মৃণাল সেনের মতো আপনিও অনেক জায়গায় মিল পাবেন । হ্যাঁ সত্যজিৎ রায় ‘অযান্ত্রিক’ থেকে অনুপ্ররনা নিয়েই ‘ অভিযান ’ তৈরি করেন তা বলা যায় । এ বিষয়ে সত্যজিৎ রায়ের সরাসরি স্বীকারক্তি নেই, তবে ঋত্বিকের ‘ অযান্ত্রিক ’ নিয়ে মূল্যায়ন পূর্বক তাঁর উক্তি,

‘ ঋত্বিকবাবু,সিনেমাটা সময় মত রিলিজ করলে আপনি পথিকৃৎ হতেন ’ ।

এই মূল্যায়ন থেকে এটা অন্তত স্পষ্ট যে , শিল্পমানের দিক থেকে সত্যজিৎ রায় অযান্ত্রিককে অন্য উচ্চতায় রাখেন ।
অযান্ত্রিক, অভিযানের পর সেই বিমল ও নরসিং ১৯৭৬ সালে ‘ট্রাভিস বিকেল’ হয়ে ‘ট্যাক্সি ড্রাইভারে’ উঠে আসলো, এমনটা বললে কি ভুল বলা হবে ? হ্যাঁ আবারও বলা ভালো , এই তিনটি চলচ্চিত্রেই স্বতন্ত্র গল্পই উপস্থাপিত হয়েছে । কোথায় যেন মিল পাবেন ট্রাভিসের সাথে নরসিং এর , নরসিং এর সাথে বিমলের । আর এই মিলনেই স্থান, সময়ভেদে তিন চালক একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে।

নিজস্ব মূল্যায়ন তৈরির জন্য বিখ্যাত এই তিনটি চলচ্চিত্র দেখা আবশ্যক, দেখা না হয়ে থাকলে দেখার অনুরোধ রইল । সত্যজিৎ রায় ও ঋত্বিক ঘটকের মধ্যকার ট্যাক্সি ড্রাইভার সম্পর্কিত একটি প্রচলিত ঘটনা দিয়ে আলোচনার সমাপ্তি টানছি ।

রাতে ঋত্বিক ঘটক ট্যাক্সি করে বাড়ি ফেরার সময় গাড়ি থেকে নেমেই ভাড়া না মিটিয়েই চলে যাচ্ছিলেন এমন সময়,

ট্যাক্সি ড্রাইভার – ‘ভাড়া, স্যার…’

ঋত্বিক ঘটক – ‘আমার কাছে টাকা নেই। তুমি এক কাজ করো – এখান থেকে সোজা ১/১ বিশপ লেফ্রয় রোডে চলে যাও। সেখানে গিয়ে দেখবে , একটা ঢ্যাঙা লোক দরজা খুলবে। ওকে বোলো, ঋত্বিক ঘটক ট্যাক্সি করে ফিরেছে , সঙ্গে টাকা ছিল না । ও টাকা দিয়ে দেবে’ ।

সেই ঢ্যাঙা লোকটি ভাড়া মিটিয়েও দিতেন, আর তিনি হলেন মানিক বাবু ,পরিচিত নাম সত্যজিৎ রায় !”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল-এর জন্মতিথি থেকে আহমেদাবাদ ও কেভাডিয়া-র মধ্যে চালু হচ্ছে সিপ্লেন পরিষেবা

হীরক মুখোপাধ্যায় (২৮ অক্টোবর '২০):- আগামী ৩১ অক্টোবর সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল-এর জন্মতিথিকে স্মরণে রেখে আহমেদাবাদ-এর 'সবরমতী নদী' থেকে গুজরাতে অবস্থিত কেভাডিয়া-র 'স্ট্যাচু...

প্রতিবাদ দিবস পালন করতে গিয়ে তৃণমূলী দুষ্কৃতীদের আক্রমণের শিকার ভারতীয় মজদুর সংঘ-র প্রদেশ নেতৃত্ব

হীরক মুখোপাধ্যায় (২৮ অক্টোবর '২০):- কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রমিক বিরোধী নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে আজ পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রাম অঞ্চলে তৃণমূল কংগ্রেস...

অবস্থান বিক্ষোভ শ্রমিকদের

মলয় সিংহ, বাঁকুড়া :একাধিক দাবি দাওয়া নিয়ে বাঁকুড়ার বড়জোড়া ব্লকের হাটআসুড়িয়ায় কালিমাতা ভেপার প্রাইভেট লিমিটেড নামে রেলের যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানার সামনে অবস্থান...

নারীর ক্ষমতায়ন:

অর্পিতা সিনহা,বাঁকুড়া(২৭অক্টোবর): বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানের জয়যাত্রা পেরিয়ে একবিংশ শতাব্দীতে জ্ঞান বিজ্ঞানের আলোকে আজ আমরা অনেকটাই পরিপূর্ণতা লাভ করেছি। সভ্যতার যে অগ্রগতি ও...