10, Aug-2020 || 02:13 pm
Home জেলা স্বামী বিবেকানন্দের মহা প্রয়ানের ১১৮ বছর

স্বামী বিবেকানন্দের মহা প্রয়ানের ১১৮ বছর

অর্পিতা সিনহা, বাঁকুড়া(৫ জুলাই ): সালটা ছিলো ১৯০২ এর ৪ঠা জুলাই।এই দিন স্বামী বিবেকানন্দের নশ্বর দেহ পঞ্চভূতে বিলীন হয়।স্বামীজীর জীবন যতটা আশ্চর্যময়তায় পূর্ণ ছিল তাঁর প্রয়াণ যেন ছিল ঠিক ততটাই বিস্ময়কর। মাত্র ৩৯বছর বয়সে তাঁর মতো একজন যোগী পুরুষের
প্রয়াণ সত্যিই মনে প্রশ্ন জাগায়। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর শরীরে কোনো অসুস্থতার চিহ্ন ছিল না। কিন্তু তিনি নিজে জানতেন তাঁর মৃত্যুক্ষণ এবং তার ইঙ্গিত তিনি তাঁর প্রিয় শিষ্যা ভগিনী নিবেদিতা কে দিয়েছিলেন। যদিও ভগিনী নিবেদিতা,স্বামী বিবেকানন্দের প্রয়াণের পরে সেই ইঙ্গিতের কথা বুঝতে পেরেছিলেন।এই মহা প্রয়ানের দিন স্বামীজি ছিলেন অত্যন্ত নির্বিকার। এই দিন তিনি খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে পড়েছিলেন। উঠেই তাঁর মনে পরে গিয়েছিল আজকের দিনটির কথা। বুকের মধ্যে তিনি অনুভব করেছিলেন নিবিড় বিচ্ছেদ বেদনা।কিন্তু পরক্ষণেই আবার সবকিছু ভুলে তিনি আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিলেন।এরপর তিনি বেলুড় মঠের প্রার্থনা গৃহে তিন ঘন্টা ধ্যান করেন এবং পরে ছাত্রদের সংস্কৃত ব্যাকরণ ও দর্শন সম্পর্কে কিছুক্ষণ উপদেশ প্রদান করেন ।এরপরে স্বামী প্রেমানন্দের সঙ্গে রামকৃষ্ণ মঠের ভবিষ্যৎ নিয়েও কিছুক্ষণ আলোচনা করেন। সন্ধ্যেবেলায় নিজের ঘরে গিয়ে ধ্যান করতে করতেই এই মহাপুরুষ আনন্দলোকে যাত্রা করেছিলেন।

   এই মহাপুরুষ স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৬৩ সালের ১২ জানুয়ারি কলকাতার এক উচ্চবিত্ত বাঙালি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পিতা ছিলেন বিশ্বনাথ দত্ত ও মাতা ছিলেন ভুবনেশ্বরী দেবী। স্বামী বিবেকানন্দের পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ দত্ত,আর তাঁর ডাক নাম ছিল বিলে।খুব অল্প বয়সেই তাঁর মধ্যে আধ্যাত্বিকতার স্ফূরণ ঘটেছিল। ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।ইতিহাস, শিল্পকলা,সাহিত্য,সমাজ প্রভৃতি সমস্ত বিষয়ের প্রতি ছিল তাঁর প্রবল আগ্রহ।এছাড়াও  বেদ, উপনিষদ,ভাগবত, গীতা,রামায়ণ, মহাভারত,পুরাণ ইত্যাদি হিন্দুধর্মগ্রন্থ পাঠেও তাঁর অত‍্যাগ্রহ ছিল।প্রথম জীবনে  নরেন্দ্রনাথ চরম যুক্তিবাদী ছিলেন। কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণের সাহচর্যে আসার পর তাঁর মধ্যে আধ্যাত্বিকতার অধ্যায় নতুনভাবে আলোড়িত হয়। শ্রীরামকৃষ্ণের সংস্পর্শে আসার আগে পর্যন্ত প্রকৃতরূপে ঈশ্বর দর্শন সম্ভব কিনা এই প্রশ্ন তাঁর মনকে বারবার আন্দোলিত করতে থাকে কিন্তু তিনি  কারুর কাছে  এর কোনো সদুত্তর  পাননি। শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে সাক্ষাতের পর নরেন্দ্রনাথ  তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন" মহাশয়,আপনি কি ঈশ্বর বিশ্বাস করেন"?এর উত্তরে শ্রীরামকৃষ্ণ হ্যাঁ বললে,নরেন্দ্রনাথ ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রমাণ চান তখন রামকৃষ্ণ দেব তাঁকে একবার স্পর্শ করায় নরেন্দ্রনাথ শিহরিত হয়ে জ্ঞান হারান।পরে তিনি অনুভব করেন যে রামকৃষ্ণ দেব একজন সাধারণ মানুষ নন।নরেন্দ্রনাথের সমগ্র  জীবন পরিবর্তিত হয়ে যায়।যদিও প্রথমদিকে নরেন্দ্রনাথ রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব কে গুরু বলে মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলেন। রাম কৃষ্ণ পরমহংসদেবের ভাবাবস্থা ও দেবদেবীর সাক্ষাৎ দর্শনকে নরেন্দ্রনাথের মনে হত কাল্পনিক। কিন্তু তাও তিনি রামকৃষ্ণের ব্যক্তিত্বের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং দক্ষিণেশ্বরে যাত্রা শুরু করে দেন।১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে হঠাৎ  পিতার মৃত্যুর পর নরেন্দ্রনাথ আর্থিক অনটনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন তিনি রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে মা কালীর কাছে তাঁর পরিবারের আর্থিক উন্নতির জন্য প্রার্থনা করতে অনুরোধ করলে রামকৃষ্ণদেব তাঁকে বলেন নরেন্দ্রনাথ যেন নিজে গিয়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন কিন্তু মন্দিরে গিয়ে নরেন্দ্রনাথ জাগতিক প্রয়োজনের কথা ভুলে গিয়ে ঈশ্বরের কাছে বিবেকও বৈরাগ্যের জন্য প্রার্থনা করে ফেলেন। এরপরেই নরেন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেন ঈশ্বরের অস্তিত্বের কথা।তিনি সংসার ত্যাগ করে রামকৃষ্ণ দেব কে গুরু বলে মেনে নিতে শুরু করেন।১৮৮৬খ্রিস্টাব্দে নরেন্দ্রনাথ সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করে রামকৃষ্ণর মতো জীবন-যাপন করতে শুরু করেন এবং নরেন্দ্রনাথ নাম ত‍্যাগ করে  স্বামী বিবেকানন্দ নাম গ্রহণ করেন। সন্ন‍্যাস ধর্মগ্রহণ করার পর  তিনি পরিব্রাজক রূপে ভারতবর্ষের নানা স্থান পরিভ্রমন করেছিলেন।১৮৯৩সালের জুলাই মাসে বিবেকানন্দ পৌঁছান শিকাগো শহরে।সেখানে ভারত ও হিন্দুধর্মের প্রতিনিধিত্ব করে বিশ্ব ধর্ম সম্মেলনে বক্তৃতা দেন।তাঁর এই বক্তৃতায় বিশ্বজনীন চেতনা ধ্বনিত হয়।তাঁর বক্তৃতায় একদিকে বৈদিক দর্শনের জ্ঞান অন্যদিকে শান্তির বার্তা সমান ভাবে স্হান  পায়। তিনি জাতীয়তাবাদ ও হিন্দু ধর্মের বাহক রূপে বিশ্বের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে স্থান  পান।  কলকাতায় ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে ১৮৯৭ খিস্টাব্দে বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠা করেন রামকৃষ্ণ মঠ ও ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে বেলুড় মঠ প্রতিষ্ঠা করেন যা ভারতীয়  জীবন দর্শনে নতুন মাত্রা এনে দিয়েছিল। স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন প্রত্যেক জীবের মধ্যেই ঈশ্বর বাস করেন তাই তিনি বলেছিলেন "জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর "।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদদের সম্মান জানাতে এসভিএফের সহায়তায় মিউজিক ভিডিও বানালো টাটা স্ট্রাকচুরা

হীরক মুখোপাধ্যায় (৮ অগস্ট '২০):-দেশের প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদদের সম্মান জানাতে 'শ্রী ভেঙ্কটেশ ফ্লিমস' (এসভিএফ)-এর সহায়তায় মিউজিক ভিডিও বানালো 'টাটা স্ট্রাকচুরা'।

অল্প বৃষ্টিতে জলমগ্ন টাকী পৌর এলাকার বিভিন্ন রাস্তা,লকডাউনের জন্যই থমকে কাজ, দ্রুত মেরামতি র আশ্বাস পৌর প্রশাসকের

সৌরভ দাশ,হাসনাবাদ: ভারি মালপত্র বহনকারী গাড়ি থেকে প্রতিনিয়ত প্রচুর মানুষের যাতায়াত, ছোট বড়ো যানবাহনের লাগামহীন চলাচল কার্যত স্থবির করে দিয়েছে টাকীর রাস্তা...

“জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০” প্রণয়নের প্রতিবাদে পুরুলিয়ায় সপ্তাহব্যাপী বিক্ষোভ আন্দোলন

বাপ্পা রায়, পুরুলিয়া:- নতুন শিক্ষা নীতি ঘোষণা করেছেন কেন্দ্রীয় সরকার। তারই প্রতিবাদে এ দিন "জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০" প্রণয়নের প্রতিবাদে পুরুলিয়ায় সপ্তাহব্যাপী বিক্ষোভ...

পুরুলিয়ায় তৃণমূল কংগ্রেস যোগদান

বাপ্পা রায়,পুরুলিয়া:- শুক্রবার পুরুলিয়া বিধানসভার হুটমুড়া অঞ্চলের বিজেপির ৪০টি পরিবার , এবং কংগ্রেসের ৫ টি পরিবার তাদের দল ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেস যোগদান...