Categories: কলকাতা

রবির কিরণে প্রজ্বলিত মুদ্রা উৎসব ২০১৯

প্রজ্ঞা পারমিতা দত্ত, কলকাতা:– ভারতীয় এবং বিদেশী ইতিহাসের একটি শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হল মুদ্রা। এই একটি জিনিস যা সময়কে ধরে রাখে নীলকন্ঠ রূপে। এর দ্বারা আমরা জানতে পারি সেই সময়ের বহু অমূল্য তথ্যের সন্ধান এবং খুঁজে পাই তার সৃষ্টির মূল কারণ। সম্প্রীতি কলকাতার বালিগঞ্জ হলদিরাম-এ কলকাতা মুদ্রা পরিষদ-এর ২২-তম বার্ষিক সম্বলন ও প্রদর্শনী পাশাপাশি ভারতীয় মুদ্রা পরিষদ -এর ১০২-তম বার্ষিক প্রদর্শন অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্ভোধন করেন পশ্চিমবঙ্গের মাননীয় রাজ্যপাল শ্রী জয়দীপ ধানকার। তার পর পুরোনো মুদ্রার সংগ্রহের কি ঐতিহাসিক মূল্য সে বার্তাই দেন সবাইকে এবং জীবনকৃতি সম্মান প্রদান করেন শ্রী বিনয় কুন্ডু এবং শ্রী অশোক জৈন-কে। প্রদর্শনী উপলক্ষে এই পরিষদের সভাপতি শ্রী রবি শংকর শর্মা বলেন তিনি মূলত এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে মুদ্রা সংগ্রহের উপকার এবং তার রক্ষনাবেক্ষন-এর উপর সচেতনতা বাড়াতেই তিনি এই সম্মেলনের আয়োজন করেন। এই প্রদর্শনীতে তার প্রদর্শনীত মুদ্রাগুলো ছিল সত্যি নজর কারা। প্রথমত এই বছরেই ছিল গুরুনানোক-এর ৫৫০-তম জন্মবার্ষিকী আর সেই উপলক্ষেই তার উপর মুদ্রিত সোনা এবং রুপোর টোকেন। এছাড়াও ছিল নেপাল থেকে বেরোনো তার উপর রুপোর মুদ্রা এবং পাকিস্তানের স্টেট ব্যাংক থেকে বেরোনো ৫৫০ টাকার মুদ্রা। তার সাথেই পুরো মুঘল সাম্রাজ্যের উপর ছিল সমস্ত মুদ্রা যার মধ্যে আছে স্বয়ং বাবার থেকে বাহাদুর শাহ জাফর। আমাদের ভারতবর্ষের প্রথম মুদ্রা বের হয় আনুমানিক ৬০০ খ্রিস্টপূর্ব। সেই সময় ১৬-টি জনপদে বিভক্ত ছিল। তার মধ্যে শঙ্কর জনপদ সব থেকে পুরোনো এবং সেই জনপদের উপর ত্রিশঙ্কু মুদ্রা দেখানো হয় । মূলত এই সময়ের মুদ্রাকে “পঞ্চ মার্ক কয়েন” বলা হয়। এ ছাড়াও ছিল বিজয়নগর সম্রাজ্যের সময়কার স্বর্ণমুদ্রা। সময়টা ছিল ১৩৩৬-১৬৪৬ খ্রিস্টাব্দ। বিশ্বর সব থেকে ক্ষুদ্র মুদ্রা আজ অবধি পাওয়া যায় এই সময় কালেই। এই মুদ্রার ওজন হত মাত্র ০.০১৫ থেকে ০.০৩ গ্রাম। এর পাশাপাশি নেপাল সম্রাজ্যের রাজা জয়া প্রকাশ মোল্লা ১৭৫০ থেকে ১৭৬৮ নাগাদ বার করে বিশ্বর সব থেকে হালকা মুদ্রাটি যাকে ফুকা ডাম বলে পরিচিত। এটি এক মোহরকে ৫১২ ভাগ করলে তার এক ভাগ হিসেবে হয়। এতই হালকা এই মুদ্রা যে একটু হালকা হওয়াতেই এই মুদ্রা হারিয়ে যাবে বা মিশে যাবে ধুলোর সাথে বলা যেতেই পারে। এছাড়াও ছিল থাইল্যান্ডের বুলেট আকারের মুদ্রাকে এবং মালায়া পেনিনসুলার থেকে বেরোনো নৌকা আকারের টিনের মুদ্রা। চীনের থেকে বেরোনো ব্যাম্বো গাছের টোকেন যা ১৮৭০ সালে মুদ্রা রূপে ব্যাবহার হত তা সত্যি নজর কারা। এমন সব অদ্ভুত জিনিসের প্রদর্শনের মাধ্যমে নজর করেছে রবি শংকর শর্মা। আরেকটি তাক লাগানো মুদ্রার প্রদর্শন দিয়েছিলেন প্রশান্ত শেঠ। তিনি মূলত দেখান পশ্চিমগঙ্গার রাজ বংশের উপর। জায়গার নামের মধ্যে গঙ্গা থাকলেও এটি আদৌ আমাদের গঙ্গা অঞ্চলের সাথে গুলিয়া গেলে বোধ হয় সব থেকে বড় ভুল হবে। এই অঞ্চলের মূলত তামিল নাডু, অন্ধ্র প্রদেশ এবং কর্ণাটক অঞ্চলে উপস্তিত। ৩৫০ থেকে ৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ৯৯-টি ভিবিন্ন রাজার উপর মূলত স্বর্ণ মুদ্রা দেখানো হয়। তাদের সেই সময় প্রথম বাজধানি ছিল কলার যা ৩৯০ এর গড়ার দিকে তালাকাদ-এ চলে যায়। এই মুদ্রাগুলির বিশ্বসত্ত হল সবেতেই হাতির ছবি থাকে। আরেকদিকে একটি করে বিন্দু থাকে যা দেখে চিনে নিতে হয় কোনটা কোন রাজার।এছাড়াও ছিল রাজীব ভানুর বারেইল্লি অঞ্চলে পাঁচলা রাজত্বের উপর মুদ্রা এবং উজ্জ্বল সাহার আলেক্সান্ডার এবং গুপ্ত যুগের সমস্ত স্বর্ণ মুদ্রা। এগুলো ছাড়াও প্রখ্যাত সংগ্রহক শ্রী সোমনাথ বসুর সংগ্রহ ছিল সত্যি নজর করা। আমাদের বাংলা এক সময় সুলটানেটদের শাসনে ছিল। সেই সময় দুই রাজা নাসির-আল-দিন-মোহাম্মদ (১৪৩৩-১৪৫৯) এবং জালাল-আল-দিন-মোহাম্মদ (১৪১৮-১৪৩২) তাদের মুদ্রা সিংহের ছবি দিয়ে বার করে যা খুবই দুষ্প্রাপ্য। সর্বশেষে সেই সময়ের রাজা জালাল-আল-দিন-ফাৎসহ আনুমানিক ১৪৮১ থেকে ১৪৮৬ মধ্যে আফগানিস্থান ভ্রমণ করতে যায় এবং প্রফেট মোহাম্মদ-এর সাথে তার দেখা হয়। সেই সময় তিনি তার খড়ম নিয়ে আসেন এবং তা এখনো মালদার গৌর অঞ্চলে গেলে দেখা যায়। সেই ব্যাপারকে স্মরণে রাখার জন্য ওই সময়ে তিনি তার নামে একটি স্বরক মুদ্রা খাজনা টাকশাল থেকে মুদ্রিত করেন। ভারতবর্ষের মধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে আঞ্চলিক মুদ্রা প্রকাশিত হত তারই চাপ এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন তপন কুমার শীল। তিনি নর্থ-ইস্ট ইন্ডিয়া থেকে বেরোনো আসাম,কোচবিহার,আরাকান,জয়ন্তীপুর এবং ত্রিপুরার মুদ্রা প্রদর্শন করেন। সৌভিক মুখার্জীর ভারতের পরিবর্তনের রূপ ফুটিয়ে তোলা তার প্রদর্শন মধ্যে দিয়ে। মূলত ভারতে ইংরেজ আসার আগে ছিল আরো অনেকে। একসময় ডেনমার্ক,পর্তুগাল,ফরাসি, ডাচ-দের মতন সাম্রাজ্যের সাথে মুখরিত হয়েছে ভারত। সর্বশেষে ইস্ট ইন্ডিয়ান কোম্পানির হাত থেকে ব্রিটিশদের হাতে চলে যায় ভারতবর্ষ। যা পরবর্তী কালে ১৯৪৭ সালে পূর্ণ ভাবে স্বাধীনতা পায়। সেই সমস্ত দুষ্প্রাপ্য সময়ের মুদ্রা তুলে ধরেছেন তিনি এখানে। ভারতীয় মুদ্রা বাদে এখানে বিদেশি মুদ্রার উপর প্রদর্শন ছিল সত্যি নজর কারা। অনিন্দ্য কর মূলত কিছু অদ্ভুত ধরণের টাকার সংগ্রহ। ১৯১৭ সালে রোমানিয়ার ১০ বাণী কে এখনো বিশ্বের ক্ষুদ্রতম ব্যাংকনোট বলে দাবি করা হয়। এবং ২০১৭ সালে মালয়েশিয়া থেকে বেরোনো ৬০০ রিংগেট কে বিশ্বের সব থেকে বড় ব্যাংকনোট বলে দাবি করা হয় যার প্রদর্শন ছিল এই জায়গায়। এছাড়াও একসময় ইসরাইল থেকে আলবার্ট আইনস্টিনকে প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রস্তাব দেয় কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। সেই উপলক্ষে তার উপর নোট যেমন ছিল তেমনি সম্প্রীতি ফিজি রাগবি খেলায় ৭ খানা স্বর্ণ পদক পায় অলিম্পিকে আর সেই উপলক্ষে একটি সাত ডলারের নোট বার করে ফিজি সরকার। সর্বশেষে ছিল শ্রী ঋদ্ধি ভট্টাচার্য মুদ্রার উপর একটি প্রদর্শনী। কলকাতার এই সর্ব কনিষ্ঠ মুদ্রা সংগ্রহক এবার দেখান খেলাধুলার উপর মুদ্রা। যেখানে ছিল ২০১১-তে বাংলাদেশ থেকে মুদ্রিত ক্রিকেট বিশ্বকাপ মুদ্রা। ২০১০ এবং ২০১৪ সালে মুদ্রিত শীতকালীন অলিম্পিকস-এর মুদ্রা। ২০১২ সালে লন্ডনের অলিম্পিকস এবং ২০১৬ ব্রাজিল-এর ওপর ছিল একটি বিশেষ প্রদর্শনী। এই সমস্ত ছাড়াও ছিল নিলামের ব্যাবস্থা যার মাধ্যমে বহু সংগ্রহক তাদের সংগ্রহে বেশ কিছু মুদ্রা পায়। আজকের এই আর্থিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থায় যে মুদ্রা কত গুরুত্বপূর্ণ ভাবে সময়কে নীলকণ্ঠ রূপে ধরে রেখেছে তারই প্রমাণ দিল এবারের কলকাতার বুকে আয়োজিত এমন এক প্রদর্শনী।

Share

Recent Posts

রাজগ্রামে রক্তদান শিবির

অভীক মিত্র, বীরভূম(২২ জানুয়ারি):  বুধবার সকাল থেকে বীরভূম জেলার মুরারই এক নম্বর ব্লকের রাজগ্রাম আজাদ সংঘের পরিচলনায় স্বেচ্ছায় রক্তদানের শিবির… Read More

8 hours ago

শান্তিপুরে তৃণমূল কর্মী খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার বিধায়ক ঘণিষ্ঠ শান্তিপুরের প্রাক্তণ ভাইস চেয়ারম্যান

স্নেহাশিস মুখার্জি, নদীয়া(১৮ জানুয়ারি): শান্তিপুরে তৃনমূল কর্মী সান্তনু মাহাতো খুনের ঘটনায় গ্রেফতার শান্তিপুরের প্রাক্তন ভাইস চেয়ারম্যান তৃণমূল নেতা কুমারেশ চক্রবর্তী… Read More

4 days ago

চায়ের দোকানে লরি, মৃত দুই

অভীক মিত্র,বীরভূম(১৮ জানুুয়ারি): শনিবার সকাল আটটার সময় সারবোঝায় একটি দশচাকা লড়ি সাঁইথিয়া থেকে লোকপাড়ার দিকে যাওয়ার সময় বাসুদেবপুর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে… Read More

4 days ago

“ফিট ইন্ডিয়া কর্মসূচি কুশমোড়ে’

অভীক মিত্র, বীরভূম: ভারত সরকারের খেল মন্ত্রালয় ও বীরভূম জেলা নেহরু যুবকেন্দ্রের পরিচালনায় বীরভূম জেলার মুরারই-২ব্লকের কুশমোড়ের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন 'কুশমোড়… Read More

4 days ago

মদ্যপ অবস্থায় ট্রেন চালানোর অভিযোগ চালকের বিরুদ্ধে

স্নেহাশিস মুখার্জি,নদীয়া(১৬ জানুয়ারি):  মদ্যপ অবস্থায় ট্রেন চালানোর অভিযোগ চালকের বিরুদ্ধে,নির্দিষ্ট স্টেশনে ট্রেন না দাঁড়ানোয় গার্ডের তৎপরতায় পরের স্টেশনে থামলো ট্রেন।বুধবার… Read More

6 days ago

পয়লা মাঘ অঘ্রান পুজোয় মাতোয়ারা বীরভূম

অভীক মিত্র,বীরভূম(১৬ জানুুয়ারি): পয়লা মাঘ অঘ্রান পুজো উপলক্ষ্যে মাতোয়ারা উঠে বীরভূম জেলা । নগরী গ্রামে বসে একবেলার ব্রহ্মদৈত্য মেলা ।… Read More

7 days ago