10, Aug-2020 || 02:36 pm

তহান

রিতা মিস্ত্রি, কোলকাতা : নানারকম সিনেমা নিয়ে আলোচনা করতে করতে আমরা প্রায়ই যে ধরণের সিনেমার কথা ভুলে যাই, তা হল শিশুদের নিয়ে সিনেমা। এমনিতেই বাঙালি হিসেবে কখনও আমরা সত্যজিৎ রায়ের বাইরে বেরোতেই পারি না। বাচ্চারা যেন রায়সাহেবের অপু, মুকুল, রুকু প্রভৃতিতেই আজ পর্যন্ত আটকে আছে। সত্যজিতের মধ্যেই আবার ফটিকচাঁদ বা পিকুকে নিয়েও আলোচনা কোথাও লক্ষ করি না বহুকাল। এটাকে কূপমণ্ডুকতা কিনা বলতে পারব না, কারণ অপরদিকে হ্যারি পটার বা লর্ড অফ দ্য রিংস প্রভৃতি নিয়ে উৎসাহের অন্ত নেই। মধ্যে থেকে হারিয়ে যায় হীরের আংটি, এমনকি দামুর মতন সিনেমা। পাঠকেরা ক্ষমা করবেন, বড়ই দুঃখের সাথে এই কথা বলছি।

সাধারণভাবে বই বা সিনেমা— যেকোনও চত্বরেই ব্যক্তিগতভাবে শিশুকিশোর বিষয়টি আমার সবচেয়ে প্রিয়। বাচ্চাদের নিয়ে বা তাদের জন্য তৈরি সিনেমা বা বই হাতের সামনে পেলে আজ অবধি তা ছাড়ি না। আর সত্যজিৎ রায় বাদেও বাংলার নানা সিনেমাকে মাথায় রেখে বলিউডের যে সিনেমাটি আমি কয়েকশোবার দেখতে পারি, তার নাম হল ‘তহান’। মকড়ি, জলপরি, বম বম বোলে, বজরঙ্গী ভাইজান, উড়ান, মাসুম, মিস্টার ইন্ডিয়া প্রভৃতি সিনেমাগুলোকে মাথায় রেখেই বলছি, ‘তহান’ মনের এমন একটা জায়গা দখল করে আছে, তা হয়ত প্রত্যন্ত কাশ্মীরের নৈসর্গিকতার জন্যই।

প্রত্যন্ত কাশ্মীরের জীবনযাত্রাকে চোখের সামনে উপলব্ধি করতে গেলে ভারতীয় সিনেমায় তহানের গুরুত্ব অপরিসীম বলেই আমার মত। রিলিজের পর বহু সমালোচক এই সিনেমা নিয়ে তাদের উচ্ছ্বাস ব্যক্ত করেছিলেন। তার সঙ্গে এই সিনেমার সিনেম্যাটোগ্রাফি ও স্টোরি নিয়ে আমার আলোচনা করা তাই আমার ক্ষেত্রে স্রেফ বাতুলতা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল তহানের শুটিং প্রায় আঠেরো বছর বাদে কাশ্মীরের পহেলগাঁও অঞ্চলে করা হয়েছিল। ছবিটির প্রত্যেকটি দৃশ্যে তাই আমরা কাশ্মীরের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারি পরিচালক ও সিনেম্যাটোগ্রাফার সন্তোষ শিভনের চোখে। সঙ্গে তৌফিক কুরেশির কম্পোজে প্রত্যন্ত কাশ্মীরি ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকও অতি মনোময়।

সিনেমাটির মুখ্য চরিত্র ‘তহান’ পহেলগাঁও অঞ্চলের একটি প্রত্যন্ত গ্রামের আট বছর বয়েসী একটি ছেলে, যার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু হল ‘বীরবল’ নামের একটি গাধা। ছোটবেলায় তার বাবা হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার পর মা, দিদি ও দাদুর সান্নিধ্যে তার বেড়ে ওঠা। বেশিরভাগ সময়ই কাটে তার বীরবলের সঙ্গেই। তার প্রতি যেন অতিমাত্রায় যত্নশীল তহান। গরীব পরিবারটি তাদের উপার্জনশীল কর্তার হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার পর থেকে খানিক বিপর্যস্ত হলেও মোটামুটিভাবে সবাই খেটে দিনযাপন করে চলেছে। ছোট্ট তহানও এর ব্যতিক্রম নয়। শৈশবাবস্থার থেকে সে বেড়িয়ে খুব তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব, এবং এই বড় হওয়ার পাশে সে তার সবসময়ের সঙ্গী হিসেবে প্রিয় বন্ধু গাধাটিকে কখনই চোখের আড়াল করতে চায় না।

কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে হঠাৎ দাদুর দেহান্ত হওয়ার পরে পারিবারিক বিপর্যয় এড়াতে তহানের মা বাধ্যই হয় মহাজনের দেনা মেটাতে বীরবলকে বিক্রী করে দিতে। এরপর আবার গাধাটিকে ফিরিয়ে আনার জন্য তহানের অভিযান নিয়ে গোটা সিনেমাটি জমে উঠেছে নানাভাবে। আমার মনে হয় ছোটদের পাশাপাশি বড়রাও এই সিনেমাটি চোখের কোনায় একটু জল নিয়েই শেষ করবেন। প্রত্যন্ত কাশ্মিরী জীবনযাপন ও সারল্য প্রতিটা দৃশ্যেই নাড়া দিয়ে যাবে দর্শক মনকে। ভারতীয় সিনেমা জগতে এই সিনেমাটি সর্বকালীন এক ছাপ রেখে গিয়েছে।

কাশ্মীরের নৈসর্গতা, সন্ত্রাস, আর্মিরাজের মাঝেও তাদের সারল্যের সম্পূর্ণ নিদর্শন পাওয়া যায় তহান এবং সিনেমাটির নানা চরিত্রের মাধ্যমে। সঙ্গে কিছু অনবদ্য মন্তাজ এক অন্য জগতে নিয়ে চলে আমাদের। বরফঢাকা পহেলগাওয়ের নৈসর্গিকতায় একাত্ম করে তোলে সন্তোষ শিবনের পরিচালনদক্ষতা। সঙ্গে যুক্ত হয় মানুষ ও চতুষ্পদের মধ্যে এক খাঁটি ভালোবাসার দৃশ্যায়ন।

এছাড়াও আরও অনেক বিষয়ই বেশ ভালোভাবে গল্পের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সেখানে যুক্ত হয় সন্ত্রাসী কারবারের মধ্যে কীভাবে কাশ্মীরি সারল্য যুক্ত হয়ে গিয়েছে এতদিন ধরে। আর্মিদের দাপট, গরীব মানুষের প্রতি মহাজনী কারবার এবং সর্বোপরি সবকিছু ছাপিয়ে বাহ্যিকভাবে কঠোর ব্যবসায়ী সুভান দার ও তার শাগরেদ জাফরের আত্মীয়তা। আজকের দিনে যখন চতুষ্পদের প্রতি মানুষের নানারকম নারকীয়তার নমুনা আমরা আকছাড় খবরের কাগজ বা সোসাল মেডিয়ায় দেখছি, তখন তহানের মতো সিনেমা যেন একরাশ ঠাণ্ডা বাতাস এনে দেয় প্রাণে। তহান যেন বার বার উচ্চারণ করে তাদের প্রতি যে “আবার তোরা মানুষ হ”।

সিনেমাটির কাস্টিং আসামান্য। তহানের মায়ের ভূমিকায় সারিকা, দিদি ফতিমা সানা শেখ, দাদু ভিক্টর ব্যানার্জি, মহাজন হিসেবে রাহুল খান্না, ব্যবসায়ী সুভান দার অনুপম খের, তার বোকাসোকা শাগরেদ রাহুল বোস প্রত্যেকেই অনবদ্য। কিন্তু এমন কাস্টিংয়ের মাঝে শিশু অভিনেতা পূরব ভাণ্ডারি তহান হিসেবে প্রত্যেকেরই মনের মাঝে একটা বড়সড় জায়গা বানিয়ে নেবে নিজের অভিনয় দক্ষতাতেই।

সিনেমা সংক্রান্ত সমস্ত বিষয় ছাপিয়ে গিয়ে গল্পের মূল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে কাশ্মীরি সারল্য ও দর্শন। যেমন যখন সন্ত্রাসবাদীদের মারফৎ তহানের মাথায় প্রোথিত করা হয় সেই চিরাচরিত প্রশ্ন যে এই পাহাড়, প্রকৃতি তথা এই কাশ্মীর আসলে কার?, তখন তহানের সামনে আসে দুটি উত্তর। কাশ্মীর মানুষের, নাকি মানুষ কাশ্মীরের? সিনেমার শেষে গিয়ে অনবদ্য কিছু মন্তাজের মাধ্যমে তহান খুঁজে পায় তার উত্তর। বিশেষত পরিষ্কার জলের হ্রদটা যখন গ্রেনেড বিস্ফোরণে ঘোলা হয়ে ওঠে, তখন যেন আমরা প্রত্যেকেই আমাদের আজকের লক ডাউন জীবনের বড় একটা উত্তর পেয়ে যাই। প্রকৃতির এই সৌন্দর্যের ধ্বংসকারী কারা? বিস্ফোরণ, কাশ্মীরি সারল্যের সুযোগ নিয়ে তাদের সন্ত্রাসী বানানোর পরিকল্পিত উদ্যোগ, আর্মির প্রভাব প্রভৃতি সমস্ত কিছুর পিছনেই যে মানুষ জড়িত। তবু মানুষ ও চতুষ্পদদের উভয়ের প্রতি কর্তব্য পালনের এক অনবদ্য দৃশ্যায়ন হয়ে ওঠে তহান-এর মতো সিনেমাগুলি।

তবুও কাশ্মীর চলতে থাকে তার মতো সারল্য বজায় রেখে। হয়ত একদিন আমরা সুদিন আসতে দেখবই সেখানে। কাশ্মীরি পণ্ডিতরাও হয়ত আবার ফিরে আসবে তাদের ফেলে যাওয়া প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত ফাঁকা ঘরগুলিতে। সমস্ত বিপর্যয়ের মাঝেও কোনও তহান আজও তার প্রিয় বীরবলকে একখানি আপেল খাওয়ানোর জন্য মাইলের পর মাইল পাড়ি দিতেই থাকবে। সমস্ত সন্দেহের উপরে উঠে তাদের হারিয়ে যাওয়া বাবারা ফিরে আসুক নিজেদের ঘরে। তহানদের সঙ্গে সমগ্র কাশ্মীরবাসীর প্রতি শুভেচ্ছা জানানো বাদে সামান্য ভারতীয় নাগরিক হিসেবে কীই বা আর করার আছে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদদের সম্মান জানাতে এসভিএফের সহায়তায় মিউজিক ভিডিও বানালো টাটা স্ট্রাকচুরা

হীরক মুখোপাধ্যায় (৮ অগস্ট '২০):-দেশের প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদদের সম্মান জানাতে 'শ্রী ভেঙ্কটেশ ফ্লিমস' (এসভিএফ)-এর সহায়তায় মিউজিক ভিডিও বানালো 'টাটা স্ট্রাকচুরা'।

অল্প বৃষ্টিতে জলমগ্ন টাকী পৌর এলাকার বিভিন্ন রাস্তা,লকডাউনের জন্যই থমকে কাজ, দ্রুত মেরামতি র আশ্বাস পৌর প্রশাসকের

সৌরভ দাশ,হাসনাবাদ: ভারি মালপত্র বহনকারী গাড়ি থেকে প্রতিনিয়ত প্রচুর মানুষের যাতায়াত, ছোট বড়ো যানবাহনের লাগামহীন চলাচল কার্যত স্থবির করে দিয়েছে টাকীর রাস্তা...

“জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০” প্রণয়নের প্রতিবাদে পুরুলিয়ায় সপ্তাহব্যাপী বিক্ষোভ আন্দোলন

বাপ্পা রায়, পুরুলিয়া:- নতুন শিক্ষা নীতি ঘোষণা করেছেন কেন্দ্রীয় সরকার। তারই প্রতিবাদে এ দিন "জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০" প্রণয়নের প্রতিবাদে পুরুলিয়ায় সপ্তাহব্যাপী বিক্ষোভ...

পুরুলিয়ায় তৃণমূল কংগ্রেস যোগদান

বাপ্পা রায়,পুরুলিয়া:- শুক্রবার পুরুলিয়া বিধানসভার হুটমুড়া অঞ্চলের বিজেপির ৪০টি পরিবার , এবং কংগ্রেসের ৫ টি পরিবার তাদের দল ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেস যোগদান...