আন্তরিকতার কোন ত্রুটি হয়নি বলেই হয়ত মা আসছেন

জেলা

স্নেহাশিস মুখার্জি , নদীয়া(১২ অক্টোবর) : প্রায় ১২০০ বছর আগে বিহারের গয়ার যদুয়াতে আদিপুরুষ স্বর্গীয় পীতাম্বর চট্টোপাধ্যায়ের জমিদারী ছিল | সেই জমিদারী বংশেরই আদিপুরুষের বসতবাটি ছিল অবিভক্ত বাংলার নদীয়া জেলার শান্তিপুরে | যা বর্তমানে তর্কবাগীশ লেনের জজ বাড়ী নামে খ্যাত | স্বর্গীয় পীতাম্বর চট্টোপাধ্যায় , গিরীশ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় , মহিমারঞ্জন চট্টোপাধ্যায় , হাজারিলাল চট্টোপাধ্যায়ের গত হওয়ার পর বর্তমানে তাঁর বংশধর সলীল কুমার চট্টোপাধ্যয় এবং তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরিরা এখনও সেই ১২০০ বছরের স্মৃতিবিজড়িত শক্তির আরাধ্য দেবী মা দূর্গার একনিষ্ঠ ভাবে পূজার্চনা করে আসছেন | এই মূহুর্তে সলীল কুমার চট্টোপাধ্যায় পূজোর দায়িত্বে থাকলেও বাড়ীর অন্যান্যরাও তাঁকে যঠেষ্ট পরিমাণে সাহায্য করেন | বনেদী জমিদার বাড়ীর রীতি অনুযায়ী বংশ পরম্পরায় বাড়ীর লোকেরাই এই বাড়ীর পূজোর পৌরোহিত্য করেন | আজও সেই রেওয়াজ চলে আসছে | সলীল কুমার চট্টোপাধ্যায়ের ভাই দীনেশ কুমার চট্টোপাধ্যায় এখন নিষ্ঠার সঙ্গে এই পৌরোহিত্যের দায়িত্ব পালন করে আসছেন | যদিও অসীম কুমার চট্টোপাধ্যায় এর আগে এই গুরু দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন | তাঁরই ভাইপো বর্তমান পৌরহিত্যের দায়িত্বে দীনেশ কুমার চট্টোপাধ্যায় | তিনি আমাদের ওয়েব মাধ্যমকে জানান বহু বছর আগের এই পূজো | দেবীপুরান মতে বা কালিকাপুরান মতে এই পূজো হয়ে আসছে | তিন দিন ধরে এই ভোগ হয় |সপ্তমীর দিন নিরামিষ , অষ্টমীর দিন মাছ , নবমীর দিন কচুর শাক সহ সতেরো আঠেরো রকমের ভোগ আর দশমীর দিন পান্তা ভাত সহ সমস্ত রকম বাসি রান্না ভোগ দেওয়া হয় | জমিদার আমলে বড় বড় নৌকায় মায়ের ভোগের সরঞ্জাম আসতো | কাটোয়া থেকে মায়ের সাজ আসতো | মায়ের পাটের নিচে একটা পঞ্চ মুন্ডির আসন আছে | যা সম্পূর্ণ মাটির তৈরি | যা আজও মার্বেল বা অন্য কোনওভাবে বাঁধানো সম্ভব হয়নি | অতীতের ইতিহাস সাক্ষী যে জমিদার বংশের অনেকেই এই বেদীটিকে বাঁধানোর কাজে উৎসাহিত হয়ে শ্রমিকদের নিযুক্ত করলেও তারা সবাই কোন এক তৃতীয় শক্তির ভয়ে ভিত হয়ে পলায়ণ করেছিল | তারপর থেকেই প্রধান বেদিটি আজও গোবর আর মাটি দিয়ে নির্মাণ করা হয় | শোনা যায় এই বেদির তলায় অনেক সম্পদ আছে | বাড়ীর অনেক পূর্বপুরুষ এই সম্পদ তুলতে গিয়ে প্রাণ ত্যাগ করেন | তবে তাঁর গলায় আক্ষেপ যে আগে পূজোর আড়ম্বর প্রচুর ছিল , কিন্তু ভবিষ্যতের সঙ্গে আড়ম্বর কমেছে | কিন্তু আন্তরিকতার কোন ত্রুটি হয়নি , আর তাই বাড়ীর লোকেদের এই আন্তরিকতার টানেই হয়ত মা আসছেন বলে তাঁদের বিশ্বাস | বাড়ীর আর এক সদস্যা রুম্পা ( সঞ্চারী ) চ্যাটার্জীর গলাতেও সেই আক্ষেপের সুর ধরা পরে | তাঁর কথায় পূজোর গুরুত্বটা কোথাও না কোথাও যেন হারিয়ে যাচ্ছে | কর্মসূত্রে যাঁরা বিদেশে আছেন তাঁরা হয়ত সবাই আসতে পারছেন না | পূজোয় একসাথে সবাই মিলে যে আনন্দ করার আমেজ সেটা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে | আগে জমিদারী আমলে ১৮ টা মহিষ ১০৮ টা পাঠা বলি হত , সেই বলির রেওয়াজ টা এখন অর্থনৈতিক কারণে তাঁরা চালিয়ে উঠতে পারছেন না | তবে মহিষ বলি পাঁঠা বলি এই পূজোতে বন্ধ হলেও কুমড়ো বলি দেওয়া হয় | তবে অর্থনৈতিক কারণে পরিমাণে কমে গেলেও কালী পূজোতে এই বলি প্রথা এখনও রয়ে গেছে | কালী ঠাকুর যখন পাটে ওঠানো হয় তখন একটা বলি হয় | তারপর সময় বিশেষে বলি চলতে থাকে | সেই বলির মাংসই তাঁরা কালী পূজোতে ভোগ হিসাবে ব্যবহার করেন | এছারাও জমিদারী আমলে বাড়ীটা ফানুস বাতিতে সাজান হত এখন আর সেটা দেখা যায় না | কিন্তু তিনিও তাঁর কাকা দীনেশ কুমার চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে বলেন যে জমিদারী আমলে আড়ম্বর প্রচুর ছিল , কিন্তু ভবিষ্যতের সঙ্গে আড়ম্বর কমলেও আন্তরিকতার কোন ত্রুটি হয়নি , আর তাই তো শক্তির আরাধ্যা মা দূর্গা দুর্গতিনাশিনী প্রতিবারের ন্যায় এবারেও
তাঁদের বাড়ীতে সবার দুঃখ বিনাশ করতে ছুটে এসেছেন | আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এটা কি কম বড় পাওনা ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *